‘ইন আমেরিকা দ্য ল ইজ কিং’

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৪, ০৭:৩০

মধ্যযুগে বিশ্বময় স্লোগান ছিল—‘কিং ইজ দ্য ফাউন্ডেশন অব জাস্টিজ’। অর্থাত্ সেই যুগে শাসকের কথাই ছিল ‘শেষ কথা’। ইহার পর সময় যতই গড়াইতে থাকে, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই রাজার যে কোনো আদেশ-নিষেধই ‘আইন’ হিসাবে শিরোধার্য হইয়া উঠে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে অষ্টাদশ শতাব্দীতে আমেরিকার মাটিতে দাঁড়াইয়া একটি চমকপ্রদ কথা বলিয়াছিলেন প্রখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক থমাস পেইন। তাহার ভাষায়, ‘ইন আমেরিকা দ্য ল ইজ কিং’। এই কথার সহজ বাংলা হইল, আমেরিকা পরিচালিত হয় আইনের মাধ্যমে। আইনই এইখানে রাজা ও সর্বেসর্বা। ইহার জলজ্যান্ত উদাহরণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পুত্র হান্টার বাইডেনের সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্র মামলায় আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আইনের প্রতি বাইডেনের শ্রদ্ধা বজায় রাখিবার অঙ্গীকার। আদালতের রায়ের পর বাইডেন দ্ব্যর্থহীনচিত্তে ঘোষণা করিয়াছেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট, ঠিক আছে...কিন্তু মামলায় আমার ছেলেকে দোষী সাব্যস্ত করিয়া জুরি বোর্ডের দেওয়া সিদ্ধান্তের প্রতি আমি শ্রদ্ধা বজায় রাখিব।’ এমনকি মামলা চলাকালীন সময়েও বাইডেনকে একাধিক বার বলিতে দেখা গিয়াছে, হান্টার দোষী সাব্যস্ত হইলেও তিনি তাহার ক্ষমতাবলে ছেলের সাজা মওকুফ করিবেন না।

আইনের শাসনের প্রতি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এহেন দৃঢ়চেতা মনোভাব ও শ্রদ্ধা আজ থেকে প্রায় আড়াই শত বত্সর পূর্বেকার পেইনের কথাকেই যেন স্মরণ করাইয়া দেয়। শুধু আমেরিকা নহে, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড বা উন্নত বিশ্বে আইনের শাসনই রাষ্ট্রের মূল আদর্শ হিসাবে বিবেচিত ও কার্যকর। ‘আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান’ বলিয়া যে একটি কথা আছে, তাহা যেন কেবল উন্নত বিশ্বের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অনেকে এই কথায় আপত্তি জানাইতে পারেন; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বে আইনের শাসনের প্রতি যেইরূপ অবহেলা, অবজ্ঞার চিত্র দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে এমন মন্তব্য অবান্তর নহে।

আইনের শাসনের প্রশ্নে উন্নয়নশীল বিশ্বে সচরাচর আমরা কী দেখিতে পাই? এই সকল দেশে আইনের শাসনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব তথা ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে আইনের চোখে সকলের সমতার কথা মুখে বলা হইলেও এইখানকার বাস্তব চিত্র বলে ভিন্ন কথা। উপরন্তু, গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত আইনের শাসন এইখানে ক্রমাবনতির পথে। এই সকল ভূখণ্ডের সরকারগুলির আচরণ ও কর্মকাণ্ডে প্রতীয়মান, এইখানে আইনের শাসন চলে না, বরং যাহা চলে তাহা হইল, ‘আইন দ্বারা শাসন’! গণতন্ত্র বা আইনের শাসনের অন্যতম স্তম্ভ হইল ‘নির্বাচন’; কিন্তু নির্বাচনের সময় এই সকল দেশে খোদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ। ভোটের সময় পুলিশ, প্রশাসন এমনকি স্পর্শকাতর বিভাগকে দেখা যায় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করিতে। তাই উন্নয়নশীল বিশ্বে আইনের শাসনের কথা বলা রসিকতার নামান্তর।

আইনের শাসন না থাকিলে একটি সময়ে আসিয়া রাষ্ট্র অরাজকতার চরম পর্যায়ে পৌঁছাইতে পারে, দেশ ও জাতি দিগ্ভ্রান্ত হইয়া যাইতে পারে। মূলত এই কারণেই উন্নত বিশ্ব সর্বাগ্রে রপ্ত করিয়াছে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধ সমুন্নত করিবার বিষয়টি। অবশ্য এই মূল্যবোধ রাতারাতি গড়িয়া উঠে নাই। বরং ইহা দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের ফসল। আধুনিক যুগের সহিত তুলনীয় না হইলেও আইনের উত্স ও সভ্য জগত্ বলিতে সেই খ্রিষ্টপূর্ব যুগের গ্রিস বা অ্যাথেন্স নগর-রাষ্ট্রকেই সকলে এক বাক্যে স্বীকার করিয়া থাকেন। উপরন্তু হাজার হাজার বত্সর পরে আসিয়া আজিকার দিনেও যথার্থই বলা হয়, ‘গ্রিসে আর যাহাই হউক না কেন, আইনের শাসনই এখনো সেই সমাজের মূল ভিত্তি’।

আইনের শাসন কতটা আদর্শ ও অনুকরণীয়, তাহা বুঝিতে মহামতি সক্রেটিসের কথা আমরা স্মরণ করিতে পারি। সক্রেটিসের তথাকথিত বিচার ও প্রাণদণ্ড কার্যকর করিবার পর অভিযোগকারীরা অবাক হইয়াছিল এই কারণে যে,  তাহাকে পালাইয়া যাওয়ার সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি পালাইয়া গেলেন না, বরঞ্চ ইচ্ছা করিয়াই মামলার সম্মুখীন হইলেন! উল্লেখ্য, সেই যুগে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের নির্বাসনে পাঠানো হইত; কিন্তু সক্রেটিস স্বেচ্ছায় আইন ও বিচারের সম্মুখীন হইয়াছিলেন, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আইনের নিকট হইতে পালাইয়া যান নাই। দেশের বিদ্যমান আইনের শাসনকে কতটা গুরুত্ব দিয়া দেখা উচিত, তাহা বুঝাইতে এই ঘটনা রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহূত হইয়া আসিতেছে যুগের পর যুগ; কিন্তু আফসোস, উন্নয়নশীল বিশ্বের ইহা যেন চোখেই পড়ে না! কেননা তাহারা চোখ থাকিতেও অন্ধ!

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন