প্রকৃতিতে কিছু মৌলের দুই বা ততোধিক রূপে অবস্থান করার বৈশিষ্ট্যকে বহুরূপতা বা Allotrop বলে। মৌলের এ রূপ বা Allotrope-গুলো পরস্পর থেকে কাঠামো, কেলাস, বর্ণ, ঘনত্ব ইত্যাদি ভৌত ধর্ম এবং বিভিন্ন রাসায়নিক গুণাবলিতে মাত্রায় ভিন্ন ভিন্ন হয়। কার্বন ব্যতিরেকে অক্সিজেন, সালফার, ফসফরাস ইত্যাদি মৌলগুলোও বহুরূপতা প্রদর্শন করে। বহুরূপতার কারণ মূলত দুটি :১. সমানসংখ্যক পরমাণু দ্বারা গঠিত একই মৌলের অণুসমূহে পরমাণুর বিন্যাসগত পার্থক্য এবং ২. একই মৌলের অণুর মধ্যে পরমাণুর সংখ্যা ভিন্নতা বা অভ্যন্তরীণ শক্তির ভিন্নতা। কার্বন পরমাণুর দুটি প্রধান রূপভেদ হচ্ছে হীরক ও গ্রাফাইট, যেখানে মূল ভিন্নতা শুরু হয় কার্বন পরমাণুর সংকরায়ণ থেকে। পরবর্তীকালে ১৯৮৫ সালে ফুলারিন নামে কার্বনের আরো একটি রূপভেদ আবিষ্কৃত হয়।
একইভাবে দুর্নীতি শব্দটিও সংজ্ঞায়িত হয় বিভিন্ন রূপভেদে। দুর্নীতি মূলত দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো আদর্শের আধ্যাত্মিক অথবা নৈতিক অসাধুতা বা বিচ্যুতিকে নির্দেশ করে। বৃহত্ পরিসরে ঘুষ প্রদান, সম্পত্তির আত্মসাত্ এবং সরকারি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নিজের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করাও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত। আবার দুর্নীতি শব্দটি যখন বিশেষণ রূপে ব্যবহূত হয়, তখন সাংস্কৃতিক অর্থে সমূলে বিনষ্ট হওয়াকে নির্দেশ করে। সর্বপ্রথম দুর্নীতি শব্দটি ব্যবহার করেন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল। পরবর্তীকালে প্রাচীন রোমের আইনজ্ঞ ও দার্শনিক মার্কস টুলিয়াস সিসারো দুর্নীতি শব্দটি ব্যবহার করেন ঘুষ এবং সত্ অভ্যাসত্যাগ প্রত্যয়ের অভিপ্রায় হিসেবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও মার্কিন গবেষক মরিস জানোভিত্জ ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারকে দুর্নীতি বলে আখ্যায়িত করেন। অর্থনীতিবিদ আই সিনিয়রের মতে, দুর্নীতি এমন একটি কার্য, যেখানে অনৈতিক অর্থ প্রদানের মাধ্যমে তৃতীয় কোনো পক্ষ সুবিধাপ্রাপ্ত হয়, যার ফলে তারা বিশেষ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে পারে, যেখানে সব পক্ষ লাভবান হয়। এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত পক্ষটিই থাকে কর্তৃপক্ষের ভূমিকায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কাফম্যান আইনকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনের ক্ষমতা আইনপ্রণেতার কাছে রক্ষিত থাকাকে ‘আইনানুগ দুর্নীতি’ বলে সংজ্ঞায়িত করেন।
একই ভাবে বিভিন্ন রূপভেদে দুর্নীতি অনেকটাই আপেক্ষিক একটি ব্যাপার। স্থান-কাল-পাত্রভেদে দুর্নীতি বিভিন্ন অবয়ব ধারণ করে। সমাজে বিভিন্ন পেশার মানুষজন দুর্নীতি করে ভিন্ন ভিন্ন আদলে। শুধু প্রশাসন, পুলিশ আর রাজনৈতিক নেতাদের দোষ দেওয়ার আগে নিজেদের চেহারা আয়নায় নিরপেক্ষভাবে একবার দেখা উচিত। মহান পেশায় নিয়োজিত শিক্ষকগণও আজ দুর্নীতি করেন বহু অভিনব পন্থায়, যদিও সব পেশাই মহান এবং উদ্দেশ্য মানবতার কল্যাণ সাধন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ঠিকভাবে পাঠদান করেন না। দিনের পর দিন ছাত্রছাত্রীদের বঞ্চিত করেন পাঠ্যসূচির মূলশিক্ষা থেকে। শ্রেণিকক্ষে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা একসময় বাধ্য হয় ঐ সব শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে। শিক্ষকদের অনেকে আবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন বিভিন্ন কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে। ফলে শিক্ষকগণ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হন বটে, তবে অনেক অসচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়েরা টিউশনির এই খরচ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খায়। সার্বিক বিবেচনায় এটি শিক্ষা খাতে বড় ধরনের দুর্নীতির একটি প্রধান রূপভেদ। কখনো কখনো অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষকদের নেক নজরে থাকায় কিছু শিক্ষার্থী এই সুযোগে মৌখিক ও ব্যাবহারিক পরীক্ষাগুলোতে বেশি নম্বর হাতিয়ে নেয়, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতির আরেকটি রূপভেদ।
বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনেও শিক্ষাদুর্নীতির রয়েছে বিভিন্ন রূপভেদ। অনেক শিক্ষকই পরীক্ষার হলে ঢিলেঢালাভাবে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। মূলত এটা কর্তব্য-কর্মে অবহেলা বৈকি। অনেকে আবার শ্রেণিকক্ষে ঠিকভাবে না পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুখরোচক গল্প করেন। বিভিন্ন সেমিনার, কনফারেন্স, গবেষণা প্রবন্ধ, জার্নাল ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর, ডিনস অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলে অথবা একনিষ্ঠ লবিং-তদবিরে পাওয়া রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুদায়িত্ব পালনকালে লব্ধ আজগুবি বিভিন্ন কিসসা-কাহিনি শুনিয়ে পুরো সময় কাটিয়ে দেন। উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদের গুরুত্বটা একটু বাড়ানো। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা অতি সহজেই ভড়কে যায়। তারা যেন বামুন হয়েই পায় চাঁদের স্পর্শ। অনেকে আবার পরীক্ষায় বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের হাতে রাখার কৌশল অবলম্বন করেন। অবশ্য পড়াতে না পারলে, অথবা ঠিকভাবে না পড়ালে নম্বর থেরাপি একটি উপযুক্ত রক্ষাকবচ, যা হোমিওপ্যাথির বড়ির মতো তাত্ক্ষণিকভাবে কাজ করে। কেউ কেউ ইনকোর্স পরীক্ষায় একই বেঞ্চে তিন জনের জায়গায় সাত জনকে পাশাপাশি বসিয়ে দেখাদেখি করে লেখার পরোক্ষ সুযোগ করে দেন। ছাত্রছাত্রীদের কাছে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন খুব উদার ও ছাত্রবান্ধব শিক্ষক হিসেবে। উদ্দেশ্য একটাই, মন জুগিয়ে তাদেরকে হাতে রাখা।
উপরন্তু, নিজেরাও ল্যাপটপ নিয়ে বসে যান ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজকর্ম সম্পাদনে। কখনো প্রজেক্ট প্রোফাইল বা রিপোর্ট তৈরি, আবার কখনো-বা গবেষণাপ্রবন্ধ লেখার ছলে নিজেদের অতি ব্যস্ততা শিক্ষার্থীদের সম্মুখে প্রদর্শন করেন। উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের কাছে বিশাল গবেষক ও অধ্যাপক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা। এতে কোমলমতি গবেষণামনস্ক শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই ওনাদের রিসার্চ গ্রুপ এবং অপশোনাল কোর্সগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। কেউ কেউ বিষয়টিকে কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখলেও এটা মূলত উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে কোনো অশুভ প্রেতাত্মার পদচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজেদের রিসার্চ গ্রুপে ছাত্রছাত্রী বাগানোর উদ্দেশ্যে তাদেরকে এভাবে অসত্ ও অনৈতিক পথে ধাবিত করাও একাডেমিক ক্রাইমের একটি বিশেষ রূপভেদ। উল্লেখ্য যে, এই অসুস্থ ধারার বাইরেও অনেক নিবেদিত প্রাণ ও সদা দায়িত্ববান মেধাবী শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন, যাদের কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যসূচির মূল বিষয়বস্তু আস্বাদন করতে পারছে। মূলত তারাই শিক্ষা ও গবেষণার জ্ঞানসাগরে সদা বহমান মূল স্রোতটির প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের নিষ্ঠা ও সততার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে আছে এবং থাকবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতির একটি অভিনব রূপভেদ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব থেরাপি, যা টনিকের মতো দ্রুত কাজ করে। বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে ছাত্রছাত্রীদের হরহামেশাই কাছে ডেকে আপ্যায়ন করা অথবা মুখে ‘বার্থ-ডে’ কেক বা বারবিকিউর মাংস তুলে দেওয়া এই থেরাপির একটি বিশেষ ধরন। যখন পর্যাপ্ত যোগ্যতা ও কর্মনিষ্ঠায় ঘাটতি থাকে, তখন এমন বাণিজ্য অনেকটাই জরুরি হয়ে পড়ে। হয়তো-বা টিকে থাকার বাজারে এটাও এক ধরনের যোগ্যতা। ফলে যেসব শিক্ষক নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেন না, তারা একসময় শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিতি পান প্রতিপক্ষ হিসেবে। গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা থাকেন ছাত্রছাত্রীদের অপছন্দের প্রথম তালিকায়। ছাত্রছাত্রীরা তাদের গবেষণাগারগুলোতে যেতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে না। কারণ সেখানে ইন্টারনেট ডেটা কাট-পেস্ট করে থিসিস অথবা গবেষণা রিপোর্ট কোনোটাই তৈরি করা সম্ভব হয় না। এমনকি কখনো কখনো অনেক ভালো পাঠদান সত্ত্বেও তাদের অপশোনাল কোর্সগুলোতে ছাত্রছাত্রী মেলে না। মূল কারণ সেখানে কম পড়ে খুব সহজেই এ+ না পাওয়া। ফলে শিক্ষানবিশরা অনেক যোগ্য শিক্ষকের সাহচর্যে জ্ঞান আহরণ ও গবেষণাকর্ম শেখা থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি এভাবে পরোক্ষ দুর্নীতির ছত্রছায়ায় ঐ সব শো-অফ শিক্ষকগণ রাতারাতি ছাত্রবান্ধব শিক্ষক ও গবেষণা স্টার হিসেবে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা পান। এটা মূলত শিক্ষা খাতে দুর্নীতির আরেকটি অভিনব রূপভেদ।
সমাজের সর্বত্র দুর্নীতি আছে। তবে শিক্ষা খাতে দুর্নীতির এমন বহুমুখী ধারা এভাবে শ্রাবণের প্লাবনের মতো বহমান থাকলে উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার মূলমন্ত্র একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশমাতৃকা হারিয়ে যাবে উন্নয়নের মূলস্রোত থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে পড়বে জাতি ও রাষ্ট্র। অতএব এখন থেকেই শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের দুর্নীতিকে আর প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। নিজেদের বিবেকই হোক শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রধান হাতিয়ার। তবেই দেশের উন্নয়ন অপ্রতিরোধ্য গতিতে হবে অবশ্যম্ভাবী।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
