ওষুধ কোম্পানিকে কেন ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হবে?

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪, ০৫:০০

হাসপাতালের সামনে রাখা সারি সারি মোটরসাইকেল। এসব মোটরসাইকেল ডাক্তার কিংবা রোগীদের নয়, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের। আর হাসপাতালের ভেতরে থাকে তাদের দৌরাত্ম্য! হাসপাতালে ভিড় করে কী করেন তারা? সাধারণত ডাক্তারদের কাছে যান, তাদের কোম্পানির ওষুধের প্রচারণা চালাতে। এবং ডাক্তাররা যাতে তাদের কোম্পানির ওষুধ রোগীদের ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশনে লেখেন, তার চেষ্টা করেন। 

এজন্য ডাক্তারদের নানা ধরনের উপহার দেয় ওষুধ কোম্পানিগুলো। এ উপহারের তালিকায় থাকে নিত্যদিনের ব্যবহার্য পোশাক, মসলা, চা, শ্যাম্পু, চাদর, বোতল, ফ্লাস্ক, ঘড়ি থেকে শুরু করে কাপ, পিরিচ, ফ্যান, চামচ, ছুরি, মশা মারার ব্যাট পর্যন্ত। ঢাকার নীলক্ষেতে বসে এ উপহারের বাজার! গত ২ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘ওষুধের দাম নির্ধারণে চরম নৈরাজ্য’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, উপহারের তালিকায় আরও রয়েছে ডলার, বিদেশ সফরের সুবিধা, গাড়ি, এমনকি বাড়িভাড়া!

হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, এই কর্মীরা ডাক্তারের চেম্বারের সামনে অনবরত ঘোরাফেরা করছেন। একজন রোগী বের হলেই একাধিক কর্মী সে রোগীকে ঘিরে ধরেন। একেক জন একেক কোম্পানির প্রতিনিধি। রোগী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ক্যামেরা সচল হয়ে ওঠে। ফটাফট উঠে যায় রোগীর ব্যবস্থাপত্রের ছবি।

একজন রোগীর ব্যবস্থাপত্র একান্তই ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর একটি বিষয়। কোনো রোগী কি ডাক্তারখানা থেকে বের হয়ে আশেপাশের সবাইকে তার রোগ ও তাকে কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে তা বলবেন? না চাইলেও আদতে বিষয়টি দাঁড়িয়েছে এমনই। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা রোগীদের থেকে বিনা অনুমতিতে নিয়ে নিচ্ছেন তাদের ব্যক্তিগত তথ্য। এ তথ্য দিয়ে তারা কী করেন? ডাক্তাররা তাদের কোম্পানির ওষুধ দিচ্ছেন কি না তা তদারক করেন? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে কি রোগী ও ডাক্তার উভয়ই এসব ওষুধ কোম্পানির কাছে জিম্মি হয়ে যাচ্ছেন না? আরও প্রশ্ন—এ তথ্য তাদের কাছে কতটা নিরাপদ? একজন নাগরিকের কি নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার অধিকার নেই?

বিষয়টি এখানেই থেমে নেই। গত ৮ জুন দৈনিক ইত্তেফাকে ‘প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে না দেওয়ায় রোগীকে মারধরের অভিযোগ’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়। এতে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে না দেওয়ায় এক রোগী মারধরের শিকার হন। এ মারধরের অভিযোগ বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। একজন রোগী তার তথ্য কেন একটি কোম্পানিকে দেবেন না, এ হলো তার অপরাধ!

আমিও বিভিন্ন হাসপাতালে দেখেছি, ডাক্তারখানা থেকে বের হতেই ছুটে আসেন কোম্পানির প্রতিনিধিরা। কখনো কখনো ডাক্তারের চেম্বারের সহকারী তুলে রাখেন ব্যবস্থাপত্রের ছবি! কোভিড-১৯-এর সময়ের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। গিয়েছি একজন ডাক্তারের কাছে কিছু সমস্যা নিয়ে। কাচে ঘেরা জায়গা থেকে ডাক্তার প্রশ্ন করলেন, কী সমস্যার জন্য এসেছি। বললাম। তারপর দীর্ঘ সময় ধরে কম্পিউটারে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন তৈরি করলেন তিনি। প্রেসক্রিপশন তৈরি করতে গিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করার পরই তিনি আমার ফোন নম্বর জিজ্ঞাসা করলেন। প্রেসক্রিপশন লিখতে এর আগে কেউ নম্বর চেয়েছেন কি না মনে করতে পারলাম না। কেমন যেন খটকা লাগল। ভাবনা সরিয়ে তার কম্পিউটারে কাজ করা দেখলাম। ভাবছিলাম সব কত আধুনিক হয়ে যাচ্ছে! প্রেসক্রিপশন প্রিন্ট করতে করতে কিছুক্ষণ তিনি ফেসবুকের নোটিফিকেশনও দেখে নিলেন। তারপর আমাকে প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে দিলেন। এতক্ষণ কাজ করে দুটি ওষুধ দিলেন। ভাবলাম, দুটি ওষুধ লিখতে এত সময় লেগে গেল!

ডাক্তার দেখিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। সে সময় মোবাইলে একটি মেসেজ এলো। মেসেজ পড়ে অবাক হয়ে গেলাম! আমি যে ডাক্তারকে দেখিয়ে এলাম, তার নাম উল্লেখ করে স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি মোবাইল অ্যাপের বিজ্ঞাপন এসেছে আমার ফোনে। তাহলে ডাক্তার যে আমার মোবাইল নম্বর নিয়েছিলেন, সেটি এজন্যই! এতক্ষণ ধরে তিনি সফটওয়্যারে আমার তথ্যই ইনপুট দিচ্ছিলেন! আমার ফোন নম্বর ও ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার অধিকার কি ডাক্তারের আছে? এ তথ্য প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়ার বিনিময়ে কি তিনি অর্থ পাচ্ছেন? তাহলে অর্থের বিনিময়ে আমার ব্যক্তিগত তথ্য কি বিক্রি হয়ে গেল না? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির খবর প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচ