ঈদুল আজহা: আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও সম্প্রীতির উৎসব

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৪, ০২:১৯

আগামীকাল সমগ্র দেশে পালিত হইতেছে মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও সম্প্রীতির উত্সব পবিত্র ঈদুল আজহা। এখানে ঈদ শব্দের অর্থ উত্সব বা আনন্দ। আর আজহার অর্থ ত্যাগ বা উত্সর্গ করা। ইহাকে কোরবানির ঈদও বলা হয়। যেইহেতু এই ঈদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষজ্ঞ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাহার নামে ও তাহার উদ্দেশে পশু কোরবানি করা। ‘কোরবানি’ শব্দের শাব্দিক অর্থ হইল নৈকট্য অর্জন করা। মর্যাদাপূর্ণ এই ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা যায়।

উল্লেখ্য, আদি পিতা আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের দেওয়া কোরবানি হইতেই কোরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হইয়াছে। ইহারপর হইতে বিগত সকল উম্মতের উপর তাহা জারি ছিল। আমাদের উপর যে কোরবানির নিয়ম নির্ধারিত হইয়াছে, তাহা মূলত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে কোরবানি দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাতে ইবরাহিমি’র অংশ। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহিম ও ইসমাইল আল্লাহর নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, বর্ষপরম্পরায় তাহারই স্মৃতিচারণ হইল ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদ। এই ঈদের মূলত দুইটি দিক রহিয়াছে :এক. আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তাহার সন্তুষ্টি লাভ এবং দুই. কোরবানির মাংস বিতরণের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত বা নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো’ (সুরা কাওসার-২)। কাফির-মুশরিকেরা তাহাদের দেবদেবী এবং বিভিন্ন কবর ও বেদিতে পূজা দেয় এবং মূর্তির উদ্দেশে কোরবানি করিয়া থাকে। তাহার প্রতিবাদস্বরূপ মুসলমানগণকে আল্লাহর জন্য সালাত আদায়ের ও তাহার উদ্দেশে কোরবানি করিবার হুকুম দেওয়া হইয়াছে। কোরবানির স্মৃতিবাহী জিলহজ মাসে হজ উপলক্ষ্যে সমগ্র পৃথিবী হইতে লক্ষ লক্ষ মুসলমান সমবেত হন ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মিনা, আরাফাত. মুজদালিফা ও সর্বোপরি মক্কা মুকাররমায়। ইহাতে আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি বিশ্বমুসলিম ভ্রাতৃত্ব। অন্যদিকে আমাদের বিত্তবৈভব, সংসার ও সমাজ সকল কিছুই মহান আল্লাহর উদ্দেশে নিবেদিত এবং কোরবানি হইতেছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক। এই জন্য আমরা পশু কোরবানির সময় এই আয়াতটি পাঠ করিয়া থাকি :‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—(সকল কিছু) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য নিবেদিত। (সুরা আনআম, আয়াত-১৬৩)।

পশু কোরবানির মাধ্যমে মানবমনে বিরাজমান যাবতীয় পশুত্ব তথা নির্মমতা, ক্রোধ, হিংসা, অত্যাচারী মনোভাবের অশুভ কর্মকাণ্ডের মূলোত্পাটন ঘটানোর দীক্ষাই কোরবানির মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ পাইয়া থাকেন। কোরবানির বিধানের মাধ্যমে সমাজে একের সম্পদে অন্যের অধিকারের বিষয়টিও বিশেষভাবে উন্মোচিত হয়। এই জন্য পবিত্র ঈদুল আজহা ত্যাগের দীক্ষায় পরিশুদ্ধ জীবন গঠন ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনও বটে। তাহাতে থাকিতে পারে না কোনো লৌকিকতা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থ। এই জন্য বড় গরু ক্রয় করিয়া বা একাধিক কোরবানি করিয়া বড়াই করিবার অবকাশ নাই ইসলামে। কেননা এই ধরনের রিয়া বা লৌকিকতা শরিয়াতে নিষিদ্ধ। ইহা ছোট শিরকেরও অন্তর্ভুক্ত। কিয়ামতের দিন রিয়াকারীরা সকলের সম্মুখে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হইবে। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, কোরবানির পশু ক্রয় ও ইহা জবাই করিয়া মাংস ভক্ষণই সকল কিছু নহে। এই সমস্ত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত তাত্পর্য ও শিক্ষা রহিয়াছে। আর তাহা হইল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। এই জন্য আল্লাহ-তায়ালা বলিয়াছেন, ‘আল্লাহর নিকট না তাহাদের কোরবানির গোশত পৌঁছে, না তাহাদের রক্ত—বরং পৌঁছে যায় তোমাদের ধার্মিকতা’ (সুরা হজ, আয়াত :৩৭)।

মানবসভ্যতার বিকাশে মুসলমানদের কোরবানির ত্যাগ ও সম্প্রীতির শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাপক। কেননা, ত্যাগ ব্যতীত কোনো সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণ করা সম্ভব নহে। ঈদুল আজহার আত্মত্যাগের শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করিয়া বাস্তব জীবনে তাহা প্রতিফলিত করিতে পারিলেই শান্তিপূর্ণ সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত হইবে। তবে এই জন্য কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসরণপূর্বক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপরও জোর দিতে হইবে। এই ব্যাপারে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার ও জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সকল নাগরিককে হইতে হইবে সচেতন ও দায়িত্বশীল। আমরা ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সকলকে জানাই অনাবিল প্রীতি ও শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন