খেলাপিঋণ:পরিত্রাণের উপায় কী?

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪, ০২:১৩

দেশে আবারও আলোচনায় আসিয়াছে খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ঋণখেলাপিদের নামের তালিকা প্রকাশের দাবি জানান স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ কে আজাদ। এই পরিপ্রেক্ষিতে এবং সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গত সোমবার সংসদকে জানান যে, শীর্ষ ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রণয়নের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রহিয়াছে। সংসদে দেশের ৩০ জন শীর্ষ ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম এবং তাহাদের নিকট ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ জানিতে চাওয়া হইলেও অর্থমন্ত্রী এই ব্যাপারে স্পষ্ট করিয়া কিছু বলেন নাই। শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকা কবে নাগাদ প্রকাশিত হইবে সেই খবরও আমাদের জানা নাই।

সম্প্রতি ঋণখেলাপি লইয়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ না করা হইলেও বলা হইয়াছে যে, চলতি বত্সরের মার্চের শেষ নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াইয়াছে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে ইহার পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। অর্থাত্ তিন মাসের ব্যবধানেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়াছে ৩৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অধিক। যেমন কিছুদিন পূর্বে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানাইয়াছে যে, সরাসরি খেলাপি ঋণ ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। ইহার বাহিরে রাইটফ বা অবলোপন, পুনঃ তপশিলিসহ মন্দ ঋণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ইহা ছাড়া অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার ৫৪৩টি মামলার বিপরীতে ১ লক্ষ ৭৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা আটকাইয়া রহিয়াছে। সকল মিলাইয়া দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের অঙ্ক দাঁড়াইয়াছে ৫ লক্ষ ৫৬ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, ২০১১-১২ অর্থবত্সরের চতুর্থ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। গত ১০ বত্সরে তাহা বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়াইয়াছে ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। আর গত বত্সর বিবিসি এক রিপোর্টে জানায়, গত ১৩ বত্সরে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়াছে ছয় গুণের অধিক।

এইভাবে খেলাপি ঋণ বাড়িয়া যাওয়ার কারণ কী? অর্থমন্ত্রী সাধারণ খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক চিহ্নিত করা এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ বিভিন্ন নিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলিয়াছেন। তবে যাহারা ব্যবসায়-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিরূপ পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হইয়া ঋণখেলাপি হন, তাহাদের কথা অবশ্যই বিশেষভাবে বিবেচনায় লইতে হইবে। বিদ্যমান আইনে খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা সম্পর্কিত বিধান অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে যাহা ইতিবাচক। কেননা আমরা দেখিতে পাইতেছি, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সমাজ এখনো নানান সমস্যায় নিপতিত ও জর্জরিত। গত ২০ জুন প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, চলতি বত্সরের জুলাই হইতে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে ক্যাপিটাল মেশিনারি বা মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি কমিয়াছে প্রায় ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমিয়াছে প্রায় ২২ শতাংশ। অনেক কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হইয়া গিয়াছে বা চলিতেছে স্বল্প পরিসরে। গ্যাসের ক্যাপটিভ (শিল্পে উত্পাদিত নিজস্ব বিদ্যুত্) ১৬ হইতে ৩০ টাকা (প্রতি ইউনিট) করা হইয়াছে। শিল্পে ব্যবহূত গ্যাসের মূল্য ১২ হইতে ৩০ টাকা করা হইয়াছে। বিদ্যুতের মূল্যও বৃদ্ধি করা হইয়াছে; কিন্তু শিল্পকারখানায় চলিতেছে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের বহুল দাবি এখনো সুদূর পরাহত। এই অবস্থায় শিল্পকলকারখানাগুলির অচলাবস্থা কীভাবে কাটিবে? ঋণের সুদহার, বিদ্যুত্-জ্বালানির অপর্যাপ্ততা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ নানান সমস্যার সমাধান কোথায়? এমতাবস্থায় উদ্যোক্তাদের ঋণখেলাপি না হওয়ার কি কোনো অবকাশ রহিয়াছে? তাহাদের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির অবসান না হইলে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিরও উন্নয়ন হইবে বলিয়া আশা করা বাতুলতা মাত্র। এই জন্য দেখা যায়, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের আমলে দুই বার ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করা হইলেও খেলাপি ঋণ কমে নাই; বরং গত এক বত্সরেই বৃদ্ধি পাইয়াছে অস্বাভাবিক হারে। এই সকল অনিচ্ছাকৃত মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের ক্ষেত্রে পুনঃ তপশিল ও পুনর্গঠন ছাড়া কি কোনো গত্যন্তর আছে?

উল্লেখ্য, খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের মুনাফা কমিয়া যাওয়ায় দেখা দেয় তারল্যের সংকট। ইহাতে নূতন করিয়া বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং সংকুচিত হয় কর্মসংস্থান। তাই ব্যাংকগুলিতে সুশাসন ফিরাইয়া আনিয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন