‘তেড়ে মেরে ডান্ডা/ ক’রে দেই ঠান্ডা’

আপডেট : ৩০ জুন ২০২৪, ০২:২৮

জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) ভারতীয় সাহিত্যে ননসেন্স রাইমের প্রবর্তক। তিনি একজন রম্যরচয়িতা ও নাট্যকারও। তাহার বিখ্যাত ছড়া ‘বাবুরাম সাপুড়ে’র শেষাংশে তিনি লিখিয়াছেন, ‘সেই সাপ জ্যান্ত/ গোটা দুই আনত?/ তেড়ে মেরে ডান্ডা/ ক’রে দেই ঠান্ডা।’ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এখন যে রাজনীতি চলিতেছে, তাহা সুকুমার রায়ের সেই ডান্ডা মারিয়া ঠান্ডা করিবার শামিল। এক শতাব্দীরও পূর্বে তিনি যখন এই ছড়া রচনা করেন, তখন সমাজে যেই অবস্থা বিরাজ করিতেছিল, এখন তেমন কোনো পরিবর্তন হইয়াছে বলিয়া দৃশ্যমান হয় না।

উন্নয়নশীল বিশ্বে যেই শাসনপদ্ধতি চালু রহিয়াছে, তাহাকে অনেকে ‘গুন্ডাতন্ত্র’ বলিয়া চালাইতে চাহেন। কেননা নির্বাচনের পূর্বে-পরে সংঘাত-সহিংসতার চিত্র অবলোকন করিয়া এমনটি মনে করা অমূলক নহে। ইহার মূলে রহিয়াছে সর্বভুক মানসিকতা। সর্বভুক হইল কিছু অবশিষ্ট না রাখিয়া খায় এমন সর্বগ্রাসী ব্যক্তি। এই সকল দেশে প্রচলিত নিয়মেই কেহ কেহ অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় লইয়া রাতারাতি ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠেন। এই সকল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যখন কোনো সরকারি বরাদ্দ যায়, তখন সর্বভুকের দল মনস্থির করে যে, কেবল তাহারাই খাইবে। ইহা লইয়াই শুরু হয় কাড়াকাড়ি, কামড়াকামড়ি ও অন্তর্দ্বন্দ্ব। এমনকি ইহা লইয়া মারামারি ও খুনাখুনিও কম হয় না। ইহার পাশাপাশি তাহারা প্রভাব বিস্তার ও প্রতিপত্তি অর্জনে হেন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নাই, যাহা করে না। স্বর্ণ চোরাচালানি হইতে শুরু করিয়া মাদকের ব্যবসায়—কোনো কিছুই তাহারা বাদ রাখে না। এই জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বের এই সকল দেশে লাঠি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক দিয়া দেশ পরিচালনা করা হয়। এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠি না থাকিলে কাহারো সাধ্য নাই দেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা। স্বৈরতন্ত্র হউক আর গণতন্ত্র হউক—যেই সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাহাদের চাইতে হিমালয়ের মতো জনপ্রিয় দল আর কেহ থাকে না; কিন্তু যখন পরিবর্তন আসিবার সময় আসে, তখন দেখা যায় সকলেই অত্যন্ত দুর্বল ও অসহায়। তখন তাহারা আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ প্রশাসন চান; কিন্তু তাহারা একবারও ভাবিয়া দেখেন না, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাহারা কীরূপ আচরণ করিয়াছেন। তাহাদের কথামতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিপক্ষদের বিনা কারণে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়া আটক রাখিয়া নির্বাচনের নামে কিছু একটা করিলেও তাহাতে ছিল না জনমতের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে যাহারা সরকারি দল করেন না, তাহাদের সরকারি বরাদ্দ না দেওয়াটা অগণতান্ত্রিক। কেননা রাষ্ট্রের সম্পদে দলমতনির্বিশেষে সকলের অধিকার রহিয়াছে। এই কারণেই যেই সমস্ত দেশে এই ধরনের ব্যবস্থা চলে, সেইখানে চার-পাঁচ বত্সর পর নির্বাচন হইলেও তাহা কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হইতে পারে না। কেননা তাহাদের সর্বগ্রাসী মনোভাব বজায় রাখিতে হইলে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা অসম্ভব।

দুঃখের বিষয় হইল, এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, দুঃখ-বঞ্চনা, হয়রানি-ভোগান্তি, জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করিয়া যখন পরিবর্তন আনয়ন করা হয়, সেই সময় দেখা যায়—যাহারা অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করিয়া ক্ষমতায় আসেন, তাহারা পূর্বের মতোই মাতিয়া উঠেন ভোগ-বিলাসিতায়। ইহা দেখিয়া জনগণের হূদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে। ফলে কিছু দিনের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়। তখন আবার একই ঘটনা ঘটে এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। অতএব রাজনীতিবিদ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্রয়-প্রশ্রয় লাভ করা দানবরূপী মানবদের ইহা স্মরণে রাখা উচিত। কেননা সৃষ্টিকর্তার অমোঘ নিয়মে পরিবর্তন আসিবেই। শেষ বিচারের দিনে মহান আল্লাহর সম্মুখে যখন আমাদের দাঁড়াইতে হইবে, তখন প্রতিটি অঙ্গপ্রতঙ্গ আমাদের সুকর্ম-দুষ্কর্মের সাক্ষ্য প্রদান করিবে। তাই উন্নয়নশীল দেশের শাসকদের সর্বদা এই কথা স্মরণে রাখিয়া চলিতে হইবে। ইহাতে যে কোনো পরিবর্তন হইলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যেন মনে করিতে পারেন যে, তাহাদের আন্দোলন-সংগ্রাম বৃথা যায় নাই। এই জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বে সকল কিছুকে ডান্ডা মারিয়া ঠান্ডা করিবার নীতি পরিহার করিয়া চলিতে হইবে। পরিবর্তনের পর জনগণ যেন না দেখেন যে, তাহাদের দেশটি আবার পুলিশি রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করিয়াছে। কেননা এই সকল দেশের জনগণ অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করে, এইভাবে চলিতে থাকিলে এই সকল দেশের রাজনৈতিক চরিত্র যে বদলাইয়া, যাইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

 

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন