তারা থাকলেন তারকা হয়ে, আর তারা?

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৪, ০৯:৩১

‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে / আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বের বুকে এমন আকুল আবেদন না করলেও তাকে সবাই মনে রাখবেন। সেই মনে রাখার কাজটা ২২ গজেও রয়েছে। ক্রিকেট বিশ্ব বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা ও রবীন্দ্র জাদেজাকেও মনে রাখবে। সংবাদ সম্মেলন করে কিংবা অনলাইনে এসে তাদের অনুরোধ করতে হবে না, ‘আমাকে মনে রাইখেন, ভুলে যাইয়েন না।’

নবম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পরে এই তিন ভারতীয় ক্রিকেটার অবসর নিয়েছেন। টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে দেখা গেলেও দেশের জার্সিতে আর টি-টোয়েন্টি খেলা হবে না কোহলি-রোহিত-জাদেজাদের। তারা সর্বোচ্চ সফলতা ছুঁয়েই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশের এই ক্রিকেটারদের ঈর্ষণীয় সাফল্য বাংলাদেশের টাইগারদের কতটুকু প্রবুদ্ধ করে, নাকি করে না?

২০১০ সাল থেকে ভারতের হয়ে ২০ ওভারের ক্রিকেট শুরু করেছিলেন কোহলি। তার তিন বছর আগে রোহিত ও এক বছর আগে জাদেজা যাত্রা শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের জার্সিতে টি-টোয়েন্টি খেলা শুরু করেন ২০০৬ সালে। পরের বছর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ শুরু করেন। হিসাব অনুযায়ী রোহিতের আগেই তারা পথচলা শুরু করেছেন। অবসর নেওয়ার আগে দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিজের ঝুলিতে পুরেছেন রোহিত। কোহলি-জাদেজাদের থলেতে ঢুকেছে একটি করে। সাকিব-রিয়াদরা কী পেয়েছেন? অভিজ্ঞতার দিক থেকে ভারতের এই তিন ক্রিকেটার থেকে এগিয়ে তারা। আগে শুরু করেছেন পথচলা। তবে হতাশা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি।

কোহলি ১২৫টি ম্যাচ খেলে ৪ হাজার ১৮৮ রান করেছেন। রোহিত ১৫৯ ম্যাচে ৪ হাজার ২৩১ রান। সাকিব-রিয়াদরা প্রায় কাছাকাছি ম্যাচ খেলে রান তোলার গতিতে নেই ধারেকাছে। ১২৯ ম্যাচে সাকিব করেছেন ২ হাজার ৫৫১ ও রিয়াদের সংগ্রহ ১৩৮ ম্যাচে ২ হাজার ৩৯৪ রান। তাদের থেকে কম ম্যাচ খেলা জাদেজা পরিসংখ্যানে পিছিয়ে থাকলেও সফলভাবে হাতে তুলেছেন শিরোপা। বাংলাদেশের এই দুই তারকা ক্রিকেটার তাহলে কী করলেন? ব্যক্তিগত সাফল্য বলতে সাকিব হয়েছিলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার। বর্তমানে ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে রয়েছেন তিনি। শীর্ষস্থান হারিয়ে ধুঁকতে হচ্ছে, অপেক্ষা তলানিতে যাওয়ার! অথচ তাদের পরে শুরু করা ভারতীয় এই তিন ক্রিকেটার দলকে দেখিয়েছেন সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়। কেবল নিজেদের বড় করে নয়, দলকে বড় করে তারা ক্ষান্ত হয়েছেন। ভারতের হয়ে আরো অনেক তারকা তৈরি হবেন, দলকে সাফল্য এনে দেবেন। কিন্তু সেই জায়গায় খোদাই করে লেখা থাকবে কোহলি-রোহিত-জাদেজাদের নাম।

বাংলাদেশ যেহেতু এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য পায়নি, সেহেতু এখানে খোদাই করে কারো নাম লেখার প্রয়াস কেউ নেননি। যারা এ দেশের ক্রিকেটকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদের মনে রেখেছেন সবাই, রাখবেন। কিন্তু এরপরে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি কেউ করতে পারেননি। যেন গোলকধাঁধার মতো ঘুরেফিরে এক জায়গাতেই শেষ হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। কেবল টি-টোয়েন্টি নয়, টেস্ট-ওয়ানডে কোথাও স্মরণীয় কিছু করতে পারেনি লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। কেবল কিছু দূর গিয়েই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ফিরতে হচ্ছে। ভারত ক্রিকেটে পুরোধা। বাংলাদেশ সে তুলনায় কেবল ধ্যানে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু যারা এলেন দলকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য, তাদের স্বপ্নটাই যখন ফিকে হয়ে যায় তখন ভক্তদের হূদয়ে রক্তক্ষরণ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। সমসাময়িকে থেকে কোহলি-রোহিত-জাদেজারা গর্বসহকারে যখন অবসরের কথা জানান, ভক্তদের অশ্রু বের করে আনেন, তখন সাকিব-রিয়াদরা নতুন স্বপ্ন দেখানোর পথে পা বাড়ান। সেই স্বপ্ন যে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে না, তার নিশ্চয়তাও নেই। তবু ছুটে চলা আছে। সাফল্যের ঝুলি কেবল অট্টহাস্যে তাকিয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে ভারত নেমেছিল শিরোপা উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্য নিয়ে। কেবল এই একটাই লক্ষ্য ভারতীয়দের তাড়া করে ফিরেছে। সফল না হতে পারলে নিজেদের ব্যর্থ হিসেবেই উল্ল্যেখ করতেন তারা। যতবার ফিরতে হয়েছে ফাইনাল থেকে, ততবারই কিছু না পাওয়ার কথা বলেছেন ভারতের ক্রিকেটাররা। কেবল শিরোপা জেতাকেই তারা সাফল্য বলেন। বিপরীতে বাংলাদেশের সাফল্য বলতে টাইগার বাহিনী কেবল কয়েকটি ম্যাচ জেতাকেই বোঝেন। কিংবা কখনো কখনো স্বপ্ন দেখতেও নিষেধ করেন তারা, ম্যাচ জেতা তো দূরের গল্প। এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে যাওয়ার বিষয়টিই টাইগার বাহিনীর কাছে সর্বোচ্চ সফলতা। সেখানে শিরোপা জেতা কিংবা সেজন্য লড়াই করার বিষয়টি যোজন-যোজন দূরে। এই চোরাবালি থেকে বের হওয়ার রাস্তা নেই, উপায় নেই। তবে স্বপ্ন দেখানোর মানা নেই।

ইত্তেফাক/এএম