বেকায়দায় মেয়র লিটন

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৪, ১৯:৫০

বেকায়দায় পড়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। গত সিটি নির্বাচনের আগে থেকেই তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের বিরোধিতার অভিযোগ ওঠে দলের এই শীর্ষ ফোরামের নেতার বিরুদ্ধে। 

সম্প্রতি জামায়াতের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ বেপরোয়া ব্যবসায়িক সম্পর্ক, দেশে সন্দেহজনক প্রক্রিয়ায় একের পর এক শিপিং কোম্পানি গঠন, বিদেশে তার অংশীদারদের নামসর্বস্ব কোম্পানিতে রহস্যময় তৎপরতা ও বিতর্কিত ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটে জড়িত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর দলীয় কোন্দলের জেরে স্থানীয় এক নেতাকে হত্যার মদদদাতা হিসেবে আলোচনায় আসে তার নাম। সবকিছু মিলিয়ে মহাবিপদে পড়তে চলেছেন আওয়ামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতা।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে খায়রুজ্জামান লিটনের কর্মকাণ্ড নিয়ে দলের ভেতরে অস্বস্তি চলছে। তবুও শহীদ জাতীয় নেতার সন্তান হিসেবে তাকে বারবারই ছাড় দিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দারুণভাবে বিরক্ত হয়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তিনি নিজে থেকে সংশোধনের পথে না হাঁটলে তার নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা।

অন্যদিকে, ১৪ দলীয় জোটের মধ্যে সংকট তৈরির জন্যও খায়রুজ্জামান লিটনের ভূমিকাকে দায়ী করা হচ্ছে। জোটের নেতাদের একাধিক বৈঠকে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। এমনকি জোটনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ১৪ দলের নেতারা সরাসরি আওয়ামী লীগের দুজন নেতার নেতিবাচক ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম খায়রুজ্জামান লিটন। বিশেষ করে সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের আগে সংকটকালেও জোটের শরিক জাসদের বিরুদ্ধে লিটনের নানা বক্তব্য অব্যাহত রাখা এবং সংসদ নির্বাচনে জোটের আরেক শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে ও কাজ করে জিতিয়ে নিয়ে আসার বিষয়টি শরিকরা ভালোভাবে নেননি। তারা মনে করছেন, কোনো বিশেষ মহলের উদ্দেশ্য সিদ্ধির এজেন্ডার অংশ হিসেবে লিটন ১৪ দলীয় জোট ভাঙতে এই কৌশলে কাজ করেছেন। ফলে জোটের বোঝাপড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগে তারাও এখন দেখতে চাইছেন লিটন ও দলের আরেক কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে জোটনেত্রী কী ব্যবস্থা নেন।  

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে খায়রুজ্জামান লিটনকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়, তা পূরণ হয়নি। লিটন কোনোভাবেই রাজশাহীর স্থানীয় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। বিশেষ করে তার স্ত্রী ও কন্যাকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তিনি অনাবশ্যক সংকট তৈরি করে চলেছেন, যা ওই এলাকায় দলকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঢাকাসহ দেশজুড়ে দলের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা বাদ দিয়ে তিনি রাজশাহীতে নিজস্ব বলয় তৈরির কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণেই ওই এলাকায় দল ও জোটের সার্বিক রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

রাজশাহী জেলার ৪টি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের ৪ সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রতিটি সিটি নির্বাচনে খায়রুজ্জামান লিটনের পক্ষে কাজ করে আসছেন। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে লিটন ক্রমাগত বদলে যেতে শুরু করেন। সবকিছু এককভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন তিনি। রাজশাহী সিটি মেয়র হওয়ার পর প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা পেয়ে তিনি ক্ষমতার ছড়ি ঘোরাতে থাকেন বেপরোয়াভাবে। তার স্ত্রী শাহিন আকতার রেনিকে রাজনীতিতে তুলে আনার পাশাপাশি তার কন্যা আনিকা ফারিহা জামানকেও তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এমনটি করতে গিয়ে তিনি দলের অনেকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন। মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর পর দলের গত কেন্দ্রীয় কমিটির শেষভাগে এসে প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে স্থান হয় লিটনের। এরপর থেকে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদকে (বর্তমানে রাজশাহী-৩ আসনের এমপি) সঙ্গে নিয়ে তিনি পৃথক একটি বলয় তৈরি করেন। এই বলয়টিই গত সংসদ নির্বাচনে তাদের ৪টি আসনেই নৌকার বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে শক্তভাবে কাজ করেছিলো বলে সংসদ সদস্যরা জানান।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও রাজশাহী-১ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবাকে ধরে নিয়ে পাকসেনারা হত্যা করে। তিনি বলেন, ‘আমার সেই শহীদ পিতাকে প্রকাশ্যে আসাদ রাজাকার বলে আর তাকে নিয়ে লিটন রাজনীতি করে। নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হওয়ার পরেও আমার বিরোধিতা করতে সে শ্রম-অর্থ সবই ব্যয় করেছে।’ ওমর ফারুক চৌধুরী ও খায়রুজ্জামান লিটন সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। ফারুক চৌধুরী আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বাড়িতেই তার পিতা আশ্রয় দিয়েছিলেন শহীদ কামারুজ্জামানসহ লিটনের পুরো পরিবারকে।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিজের রাজনৈতিক বলয় তৈরি করতে খায়রুজ্জামান লিটন কিছুদিন আগে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল করানোর ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, এরপর তার সমর্থকদের মাঠে নামিয়ে দেন দলের ওই নেতার বহিষ্কারের দাবিতে। তাকে নানাভাবে হেনস্তা করেও ক্ষান্ত হননি তিনি, ডাবলু যাতে দলীয় কাজে ভূমিকা রাখতে না পারেন, সেজন্য তিনি তার সমর্থকদের কাজে লাগিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করার কারণে মহানগর আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ নিজেদের সরকারের আমলেই বিপদে পড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সাংগঠনিক তৎপরতায়। বর্তমানে সংগঠনের কাজ নগরীর রাণীবাজারের একটি ভাড়া ভবনে খায়রুজ্জামান লিটনের ব্যক্তিগত কার্যালয় কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী কাজী আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘উনি (লিটন) তো আমাদের অভিভাবক। আমরা তো তাকে মাথার উপরে রাখি। কিন্তু তিনি যেসব কাজ করেছেন, তা তার মর্যাদাকেই নষ্ট করেছে। তিনি ভোটে আমার বিরোধিতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে তো মদদ দিয়েছিলেনই, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর যখন নগরীতে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তারপর তিনি পাল্টা সমাবেশ ডেকে সংবর্ধনার স্থানকে পবিত্র করার ঘোষণা দিয়েছেন। উনার কাছ থেকে এটা প্রত্যাশা করা যায় না।’

রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, নির্বাচনের আগে তিনি নিজে একাধিকবার খায়রুজ্জামান লিটনের কাছে গিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কালাম বলেন, ‘উনি এক রাজশাহী-৩ আসনেই ৩-৪ বার জনসভা করেছেন। কিন্তু আমার এলাকায় একটিবারের জন্যও আসেননি। আমার জানামতে, অন্য আসনগুলোতেও নৌকার প্রার্থীদের পক্ষে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি।’

শুধু সংসদ নির্বাচনেই নয়, এর আগে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থীদের বিরোধিতা করার অভিযোগ আছে লিটনের বিরুদ্ধে। রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মীর ইকবাল বলেন, ‘নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে শেষ বয়সে এসে জেলা পরিষদের প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক দলীয় সমর্থন দেন। কিন্তু রাজশাহীতে খায়রুজ্জামান লিটনের আচরণ আমাকে হতাশ করে।’ তিনি দাবি করেন, তাকে হারাতে দলের এই প্রেসিডিয়াম সদস্য সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখেছেন, যার প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।

সম্প্রতি রাজশাহীর বাঘায় লিটনপন্থিদের হামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল নিহত হন। এ ঘটনার পর রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম অভিযোগ করেন, বাবুলকে হত্যার পেছনে লিটন ও আসাদের ইন্ধন রয়েছে। লিটন অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা শাহরিয়ারকে দায়ী করেন। তবে এ ঘটনার পর লিটনপন্থিরা রাজশাহী মহানগরীতে শাহরিয়ার আলমের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন এবং সামাজিক মাধ্যমে আক্রমণ শুরু করেন।

শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নানা সংকট তৈরি করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের দলের একজন ত্যাগী নেতাকে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। এটা মেনে নেয়া যায় না। এভাবে চলতেও পারে না।’ নিহত বাবুলের বড় পুত্র আশিক জাবেদ লাবুও দাবি করেন, তার পিতাকে হত্যার পেছনে দলের একজন শীর্ষ নেতার মদদ আছে। 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, দলের এই পরিস্থিতি নিয়ে খোদ দলীয় প্রধান অসন্তুষ্ট। বিষয়টি অনুধাবন করে কেন্দ্র থেকে খায়রুজ্জামান লিটনকে এরই মধ্যে স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়েছে। এরপর সোমবার সকালে মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে লিটনপন্থি নেতারা ‘দলের কাছে বিচার দিয়ে’ শাহরিয়ার আলমের বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি পালন না করার ঘোষণা দেন।

জানতে চাইলে রাজশাহী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘আমি বহু আগেই প্রকাশ্য সমাবেশে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটি পরিবারের সঙ্গে জামায়াতের ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছিলাম। এরপরেও তা থামেনি। বরং উল্টো সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হওয়ার পরেও আমার বিরোধিতা করা হয়েছে প্রকাশ্যে। আওয়ামী লীগকে মাঠেই নামতে দেয়া হয়নি। এখন তো পত্রিকায়ও এসেছে যে, ওইসব জামায়াতী গ্রুপের সঙ্গে তাদের কী ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে।’ ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম এই নেতা দাবি করেন, শুধুমাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থে রাজশাহীর রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঘটানো হচ্ছে, যা ঠেকানো না গেলে সবাইকেই বিপদে পড়তে হবে।

এসব নিয়ে কথা বলতে খায়রুজ্জামান লিটনের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন, তার ইমেজ নষ্ট করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষ গণমাধ্যমে খায়রুজ্জামান লিটন ও তার পরিবারের বিতর্কিত ব্যবসায়িক তৎপরতা নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, তারা এমন প্রক্রিয়ায় একটি ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন, যা বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচারের (টিবিএমএল) সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইত্তেফাক/পিও