তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা যেন ললাটের লিখনে পরিণত হইয়াছে। নির্বাচনের পূর্বে ও নির্বাচনের দিন তো বটে, নির্বাচনের পরও এই সকল দেশে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সহিংসতা অব্যাহত থাকে। বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশের একটি অঙ্গরাজ্যসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে এমন সংঘাত-সংঘর্ষ নূতন কিছু নহে। তবে অধিকাংশ দেশে নির্বাচনের কিছুদিন পর তাহা স্তিমিত বা বন্ধ হইয়া যায়; কিন্তু কোনো কোনো দেশে তাহা সহজে বন্ধ হয় না, বরং তাহার জের মাসের পর মাস এমনকি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া চলিতে থাকে।
সম্প্রতি উন্নয়নশীল দেশের একটি মানবাধিকার সংগঠন জানাইয়াছে যে, চলতি বত্সরের জানুয়ারি হইতে মে পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে দেশটিতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দ্বন্দ্বে নিহত হইয়াছেন ৩৩ জন। তাহাদের মধ্যে ২৭ জনই ক্ষমতাসীন দলের লোক। অবশ্য এই হিসাবে সেই দেশটির বাহিরে নিহত ও বহুল আলোচিত একজন সংসদ সদস্যকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয় নাই। তাহাকে ধরিলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়াইবে ২৮ জন। এই সময় দেশে মোট রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটিয়াছে ৩৯৩টি। ইহাতে আহত হইয়াছেন ৩ হাজার ২২৪ জন। আরো উল্লেখ্য যে, ৩৯৩টি রাজনৈতিক সহিংস ঘটনার ২০১টিই হইয়াছে ক্ষমতাসীন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে, যাহাদের অধিকাংশই আবার কোনো না কোনোভাবে সেই ক্ষমতাসীন দলটির সহিত সম্পৃক্ত। জাতীয় নির্বাচনের পর কয়েক স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দেখা গিয়াছে তাহা অংশগ্রহণমূলক হয় নাই। প্রধান প্রধান বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করিলেও নির্বাচনোত্তর সহিংসতার হেতু কী? ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই সকল সহিংসতা স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, কোন্দল ও কলহের বহিঃপ্রকাশ। ইহাতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হইতেছেন।
কেহ নির্বাচনে না আসিলে অন্যের জন্য মহাসুযোগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নহে; কিন্তু প্রশ্ন জাগে, ইহার পরও অভ্যন্তরীণ মারপিট চলিতেছে কেন? বিশেষত যখন কোনো ক্ষমতাসীন দলে সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়, তখন সংগত কারণে সেখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা দেখা দেয়। কেননা তাহারা আসলে সেই দলের লোক নহেন, তাহারা বর্ণচোরা ও মুখোশধারী; কিন্তু এই নূতনরা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তাহাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানো এবং নিজ নির্বাচনি এলাকাকে চিরস্থায়ী করিবার জন্য উঠিয়াপড়িয়া লাগেন। এই জন্য নির্বাচনের পরপরই নিজ দলের প্রতিপক্ষদেরও ঝাঁটাইয়া ও পিটাইয়া বাহির করিয়া দিতে চাহেন। যেইভাবে ও যেই পরিপ্রেক্ষিতে তাহারা নির্বাচিত হইয়াছেন, নির্বাচনের পরও তাহাদের সেই একই সদম্ভ বিচরণ ও আচরণ চলিতে থাকে। এখানে অন্য দলগুলির নির্বাচন না করিবার কারণ হইল, তাহাদের দাবি—নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হইতে হইবে। তবে অন্যরা বয়কট করিবার কারণে তাহাদের বয়কট করিবার কি কোনো কারণ রহিয়াছে? তাহাদের বিশ্বাস, নিজেদের মতো নির্বাচন করিয়াও তাহারা ঠিকই উতরাইয়া যাইতে পারিবেন; কিন্তু যাহারা একবার ফ্রাংকেনস্টাইনের মনস্টারের জন্ম দেন, সেই দানব নিজ প্রভুকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না। ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা। আজি হইতে ২০০ বত্সর পূর্বে ঔপন্যাসিক মেরি শেলি অল্প বয়সে লিখেন ‘ফ্রাংকেনস্টাইন :অর দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’ নামে একটি ভৌতিক উপন্যাস ও কল্পকাহিনি। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র একজন সুইডিশ তরুণ বিজ্ঞানী যাহার নাম ড. ভিক্টর ফ্রাংকেনস্টাইন। যিনি সৃষ্টি করেন একটি মনস্টার বা দানব। শেষ পর্যন্ত এই দানবের হস্তে তাহার স্রষ্টার নির্মম মৃত্যু হয়। এত বত্সর পরও তাহার এই চরিত্রটি বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যাহারা ক্ষমতাসীন থাকেন, তাহারা এই সকল দানব তৈরি করিয়া ভাবেন তাহারা তাহাদের লোক; কিন্তু এই দানবরাই একদিন তাহাদের করুণ পরিণতি ডাকিয়া আনে।
তৃতীয় বিশ্বে এইভাবে যেই সকল মনস্টারের জন্ম হইয়াছে, তাহারা আজ বুক ফুলিয়া হাঁটিয়া বেড়াইতেছে। ভাবখানা এই যে—তাহারা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্পর্শকাতর বিভাগের সাহায্যে কীভাবে নির্বাচিত হইয়াছেন, সেই ব্যাপারে অন্য কেহ কিছুই জানেন না। অথচ তাহাদের ব্যাপারে আইনের শাসন কাজ করিলে এবং দল ও সংগঠন হইতে কার্যকর পদক্ষেপ লওয়া হইলে এমন পরিণতি দেখিতে হইত না বিশ্ববাসীকে।
