বন্যা পরিস্থিতি: প্রয়োজন সতর্কতা অবলম্বন ও পূর্বপ্রস্তুতি

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪, ০৩:০৫

আষাঢ় মাসের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিয়াছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদনদী। ফলে এক মাসে দুই দফা বন্যার পর আবার জলমগ্ন হইয়া পড়িয়াছে দেশের বিভিন্ন এলাকা। গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানাইয়াছে, এই অঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি সমতলে সামগ্রিকভাবে বাড়িতেছে, যাহা আগামী ২৪ ঘণ্টায় অব্যাহত থাকিতে পারে। ইহা ছাড়া সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার কতিপয় নিম্নভূমিতে বন্যা পরিস্থিতির সামান্য অবনতি হইতে পারে এবং মৌলভীবাজার জেলার বন্যা পরিস্থিতি থাকিতে পারে স্থিতিশীল। বৃদ্ধি পাইতে পারে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মা নদীর পানি। বিশেষত উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদনদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাইয়া কতিপয় পয়েন্টে বিপত্সীমা অতিক্রম করিতে পারে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মুহুরী, ফেনী, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাইয়া বিপত্সীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হইতে পারে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশের ১১০টি পর্যবেক্ষণাধীন পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে ৯০টি স্টেশনে পানি বৃদ্ধি পাইয়াছে, কমিয়াছে ১৯টি ও অপরিবর্তিত রহিয়াছে একটি স্টেশনে। বিপত্সীমার উপর দিয়া পানি প্রবাহিত হইতেছে ৯টি স্টেশনে। আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও তত্সংলগ্ন উজানে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রহিয়াছে। তাই সংগত কারণে এই সময় বন্যা পরিস্থিতি লইয়া সরকার ও সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এই মুহূর্তে শুধু বাংলাদেশ নহে, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের আসামেও বন্যা পরিস্থিতি নাজুক। সেখানে পানিবন্দি হইয়া পড়িয়াছেন ছয় লক্ষাধিক মানুষ। সেখানকার ১৯ জেলার অবস্থা ভয়াবহ। আট নদীর পানি বিপত্সীমার উপর দিয়া প্রবাহিত হইতেছে। আর এই বত্সর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে ২৫ লক্ষাধিক মানুষ। বাস্তুচ্যুত হইয়া ৩০ হাজার লোক আশ্রয়কেন্দ্রে রহিয়াছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে আরো একটি স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হইতে পারে। তাই যেখানে যেখানে দরকার সেখানে জরুরি সহায়তার হস্ত সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। বন্যা-উত্তর পুনর্বাসন কর্মসূচি আরো গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় প্রায়শ পানিবাহিত নানান রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। তাই প্রয়োজনীয় ঔষধ ও চিকিত্সা উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করিতে এখন হইতেই পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক।

স্মর্তব্য যে, ২০২২ সালে সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছিল। তখন আমরা বন্যা পরিস্থিতি লইয়া বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করিয়াছিলাম। তখন দেখা গিয়াছে বন্যা মোকাবিলায় দেশে-বিদেশে আমাদের অনেক সুনাম থাকিবার পরও সিলেটের মতো বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য আমাদের প্রস্তুতি ছিল যথেষ্ট দুর্বল। অবশ্য ১২২ বত্সরের ইতিহাসে সেই বন্যার মাত্রা ও তীব্রতা ছিল অধিক। এই সময় আমাদের সক্ষমতার একটি বিষয়কে কাজে লাগানো হয় নাই। তাহা হইল স্যাটেলাইটের তথ্য। এই বার যেন তেমন ভুল না হয়। স্যাটেলাইট হইতে দুর্যোগের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরপরই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের পূর্বেই নিরাপদ স্থানে সরাইয়া লইতে হইবে। এই জন্য আশ্রয়কেন্দ্রগুলিকে পূর্ব হইতেই প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। জরুরি ত্রাণ সরবরাহ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির জন্যও থাকা দরকার পূর্বপ্রস্তুতি। বিদ্যুত্ সরবরাহ ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার, কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বীজ সরবরাহসহ নানা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে পুনর্বাসন কর্মসূচিতে। ইহাছাড়া কোনো দেশে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করিলে যুদ্ধ পরিস্থিতির ন্যায় তাহা মোকাবিলা করিতে হয়। এই সময় বেসামরিক প্রশাসন তাহা একা মোকাবিলা করিতে পারে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিদ্যুত্ ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ইত্যাদি সকলের আন্তরিক চেষ্টায় তাহা মোকাবিলা করিতে হয়। এই বার সার্বিক পরিস্থিতি এখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণেই রহিয়াছে। তাহার পরও পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণে অবহেলা কাম্য হইতে পারে না। গতকালের খবর অনুযায়ী গত জুন মাসের মৌসুমি বন্যা হইতে পুনরুদ্ধারে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলাকে সহায়তা করিতে ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ইউএসএআইডি) মাধ্যমে সাড়ে তিন লক্ষ ডলার মানবিক সহায়তা প্রদান করিতেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর হইতে দেশটি বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে বিনিয়োগ করিয়াছে ৮ বিলিয়ন ডলারেরও অধিক অর্থ। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলি আগাইয়া আসিবে, ইহাই স্বাভাবিক।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন