প্রুতিদিন ফেসবুক, ইউটিউব খুললে একটি গান বারবার ভেসে আসে। আশপাশে সবার মুখে মুখে গানটি শুনি। ‘তুমি কোন শহরের মাইয়াগো লাগে উরাধুরা...’ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানতে পারলাম, গানটার প্রতিদিন মিলিয়ন ভিউ হচ্ছে। ভীষণ জনপ্রিয় এই গানটি শুনতে শুনতে গানটা আমারও প্রিয় হয়ে গেছে। বিনোদন আছে, তবে গানটিতে কোনো মেসেজ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা প্রতিদিন এই গানটির ওপর রিল তৈরি করছেন। গানটি সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তুফান’ ছবির আইটেম সং। গানটির গায়ক আমার প্রিয় বন্ধু প্রয়াত খালিদ হাসান মিলুর ছেলে প্রীতম হাসান ও গায়িকা ডিবিসি নিউজ চ্যানেলের সংবাদ পাঠিকা দেবশ্রী অন্তরা। ছবিটির পরিচালক বয়সে তরুণ রায়হান রাফি। নায়ক শাকিব খান, নায়িকা ভারতের মিমি চক্রবর্তী। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটির ওপর শত শত রিভিউ লক্ষ করলাম। অনেকে আবার নায়ক-নায়িকাকে প্রশংসা করতে করতে চান্দে নিয়ে গেছে। শুধু বিনোদনের জন্য নয়, ছবির রিভিউর সত্য-মিথ্যা যাচাই এবং ছবি নির্মাণের মান বুঝতে ছবিটি দেখতে আগ্রহী হলাম। গতকাল (১ জুলাই ২০২৪) সীমান্ত স্কয়ারের স্টার সিনেপ্লেক্সে ছবিটা উপভোগ করলাম। এককথায় চমত্কার একটি সিনেমা।
সেই কবে যে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেছি! ৮৩ গ্রুপের আমার খুব কম বন্ধুকেই খুঁজে পাওয়া যাবে যে ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ ছবিটি দেখেনি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে ‘জোছনা কমিটি’ গঠিত হয়েছিল। জহরুল হক হলের ছাত্রদের জন্য শিডিউল দেরিতে দেওয়ায় বলাকা সিনেমা হলের গেট ভাঙচুর করা হয়েছিল। সঙ্গে আমিও ছিলাম। তখন প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন হলে ছবিটি চলছে। পরিচালক ছিলেন প্রয়াত তোজাম্মেল হোসেন বকুল। এমন ব্যবসা সফল ছবি বাংলাদেশ সৃষ্টির পর আর হয়নি। একেই বলে পরিচালকের কারিশমা। ছবি ভালো চললে প্রযোজক লাভবান হন। প্রযোজক লাভবান না হলে ছবিতে বিনিয়োগ করতে উত্সাহী হবেন না। আমাদের দেশে অনেক সুদক্ষ পরিচালক থাকলেও বিগ বাজেটের অভাবে অনেক ভালো ছবি নির্মাণ করা হয় না। এহতেশাম, জহির রায়হান, সুভাষ দত্ত, খান আতা, চাষী নজরুল ইসলাম, কাজী হায়াতের সুদক্ষ পরিচালনায় আমরা অনেক কালজয়ী সিনেমা দেখতে পেয়েছি। একটি সিনেমা শুধু একটি গল্প নয়। এটি সমাজের চিত্র। দর্শকদের জন্য থাকে অনেক মেসেজ; অনেক শিক্ষা। আনন্দ-বিনোদনের এক উত্তম মাধ্যম এ সিনেমা-জগত্।
সে ৮৭/ ৮৮ সালের ঘটনা। এরপর সিনেমা হলে গিয়ে আর কখনো সিনেমা দেখার সময় ও সুযোগ হয়নি। সস্তা মানের বিষয়বস্তু থাকায় এখন আমি টেলিভিশনেও দুই-চার-দশ মিনিটের বেশি নাটক-সিনেমা দেখি না। যে মানের নাটক-সিনেমা হয়, তা ইয়াং শ্রেণি ও বেকারদের বিনোদন দিতে পারলেও আমাদের বয়সের মানুষদের বিনোদন দিতে পারে না। ভালো কোনো নাটক, সিনেমা যে হয় না, তা বলব না। রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে এবং সময়ের অভাবে আমার দেখা হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। রুচিরও পরিবর্তন হয়।
‘তুফান’ ছবিটা এককথায় একটি দৃষ্টিনন্দন সৃষ্টি। থ্রিলার, বিনোদন আছে। শাকিব খানের অভিনীত কোনো সিনেমা এর আগে আমার দেখা হয়নি।
এই প্রথম। পর্দায় যা দেখলাম, তাতে শাকিব খান বলিউডের কোনো অভিনেতাদের চেয়ে কম নয়। আসলেই শাকিব খান একজন শক্তিমান অভিনেতা। একজন শান্তশিষ্ট ছেলের শীর্ষ সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার গল্প। কোনো মানুষ সহজে সন্ত্রাসী হয় না। সমাজ, পরিবেশ, পরিস্থিতি তাকে সন্ত্রাসী হতে বাধ্য করে। সিনেমায় শাকিব খানের সন্ত্রাসী হওয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার স্বার্থ আদায়ে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার এ দেশে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের বাস্তবতার এক সঠিক চিত্র। গল্পটা বেশ চমত্কার। ছবিতে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাস্তানি বর্তমান কলুষিত সমাজেরই এক আখ্যান।
ইংরেজি সাহিত্যের একজন ছাত্র হিসেবে কোনো নাটক, গল্প, উপন্যাস আমি শুধু বিনোদনের জন্য ও দেখার জন্য দেখি না এবং পড়ি না। আমি এর ভেতর ঢোকার চেষ্টা করি এবং মান যাচাই করি। ‘তুফান’ ছবিটা আমি মনোযোগ সহকারে দেখলাম। দেখলাম বললে ভুল হবে, পর্যবেক্ষণ করলাম।
এককথায় অসাধারণ। এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর জীবনভিত্তিক গল্প, কাহিনি। তবে কাহিনি বেশ অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। বিনোদন দিতে গেলে এরকম অতিরঞ্জন হয়তো করার প্রয়োজন আছে। কিন্তু গল্পটা আরো সুন্দরভাবে সাজানো যেত। শুরু ও শেষটা আমার কাছে একটু অগোছালো মনে হয়েছে, যদিও চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। মিমি চক্রবর্তী, গাজী রাকায়েত, ফজলুর রহমান বাবু, সালাউদ্দিন লাভলু, মিশা সওদাগর, নাবিলাসহ সব কলাকুশলীর অভিনয় ছিল দেখার মতো। চঞ্চল চৌধুরী যে এত ভালো অভিনয় করে, তা এ ছবি দেখার আগে কখনো বুঝতে পারেনি। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী যখন পুলিশ অফিসার হিসেবে নিজেকে এসি আকরামের পরিচয় দিল, তখন আমি নস্টালজিক হয়ে গেলাম। কেননা পুলিশের এসি আকরাম এই নামটা আমাদের সমসাময়িক সবারই পরিচিত। পুলিশের এই চৌকশ অফিসার ছিলেন নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসীদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। বাংলাদেশের বড় বড় শীর্ষ সন্ত্রাসীকে তিনি আটক করে জেলে পাঠিয়েছেন। ছবির কাহিনির সঙ্গে কোনো এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আমি মিল খুঁজে পেলাম। সে এখন বিদেশে আলিশান জীবন যাপন করছে। নামটা আর নাই-বা বললাম। এই শীর্ষ সন্ত্রাসী এখনো বিদেশে বসে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করে।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যে নিজের জীবনকে বাজি রেখে সন্ত্রাসীদের ধরেছে, জনগণকে স্বস্তি দিয়েছে, যার ভয়ে সন্ত্রাসীরা বিদেশে পালিয়েছে, সেই সত্ ও চৌকশ পুলিশ অফিসার এসি আকরামের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেত্রীর নির্দেশে সিদ্ধেশ্বরী থেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেলকে এসি আকরামের টিমের সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। নির্যাতন করার কারণে পরবর্তীকালে মৃত্যুবরণ করলে এর দায়ে এসি আকরামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অনেক বছর জেল খাটার পর রাষ্ট্রপতির কৃপায় ক্ষমা পান। শুনেছি তিনি আর বেঁচে নেই।
এসি আকরামের দণ্ডাদেশের কারণেই মনে হয় পরিচালক রায়হান রাফি ছবির শেষ অংশে পুলিশের ভূমিকাকে বিতর্কিত করেছেন। বিষয়টা সেন্সর বোর্ডের দেখা দরকার ছিল। ছবিটায় বিনোদন আছে। তবে তরুণ প্রজন্মের জন্য শেখার কিছু নেই। ছবিতে যুবক শ্রেণির জন্য ভালো একটা উপদেশ থাকা দরকার ছিল।
সমালোচনা খুব সহজ। কিন্তু সৃষ্টি খুব কঠিন। এ প্রসঙ্গে A S Hornby লেখা Making a Film গল্পটির কথা মনে পড়ল। দুই-এক ঘণ্টা বা তার কম বা বেশি সময় ধরে বসে আমরা যে ছবিটা উপভোগ করি, তা তৈরি করতে হাজার ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। কত মেধাশ্রম এর পেছনে ব্যয় হয়, তা দর্শকরা উপলব্ধি করতে পারে না। সৃষ্টিশীল কোনো কাজ দিয়ে কাউকে বিনোদন দেওয়া সত্যিই কঠিন। বাংলাদেশের প্রতিভাবান পরিচালক রায়হান রাফি আরো ভালো ভালো ছবি উপহার দেবে। কিশোর, তরুণ ও যুবকদের জন্য ভালো কোনো মেসেজ থাকবে তার পরবর্তী সিনেমায়। সবাই আবার হলমুখী হবে। সিনেমা শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। একটু কষ্ট করে হলে গিয়ে সিনেমা দেখলে সিনেমা শিল্প বাঁচবে। সবার সুস্থতা ও মানসিক শান্তির জন্য বিনোদন অপরিহার্য। আশা করি গুণী পরিচালকরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সিনেমা জগেক এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের দিকে লক্ষ রেখে বিনোদন দিয়ে যাবেন।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; প্রেসিডিয়াম সদস্য, বঙ্গবন্ধু পরিষদ
