এক বছরে ট্রেন আটকা পড়েছে পাঁচবার

লাউয়াছড়া উদ্যানে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৮

লাউয়াছড়া উদ্যানের ভেতরে আট কিলোমিটার রেলপথ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পাহাড়ি টিলা ও রেলপথে ত্রুটিজনিত কারণে গত এক বছরে এই এলাকায় পাঁচবার ট্রেন আটকা পড়ে। চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। ফলে ঝুঁকি নিয়েই এ সেকশনে ট্রেন চলাচল করছে। সরেজমিন ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট-আখাউড়া সেকশনের লাউয়াছড়া উদ্যানের আট কিলোমিটার রেলপথে রয়েছে পাহাড়ি টিলা। ছোটো বড়ো ছয়টি কালভার্ট ব্রিজ রয়েছে। এদের অধিকাংশই নাজুক হয়ে পড়ছে। জয়েন্টসমূহে নাট বল্টু, স্লিপার ভাঙা, স্লিপারের হুক নেই, স্লিপারসহ রেলপথে পাথর শূন্য হয়ে পড়েছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে ক্লিপ, হুক, নাট বল্টু, স্লিপার, ফিসপ্লেট, গার্ডার অকেজো হয়ে পড়েছে। বনের বাইরের রেলপথ ও ব্রিজ, কালভার্টসমূহেও একই দশা।

১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণে এই রেলপথের অপূরণীয় ক্ষতিসাধিত হয়। ফলে দীর্ঘদিন ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। পুড়িয়ে যাওয়া রেলপথ জোড়াতালি দিয়ে চালু করা হলেও পরিপূর্ণ কাজ না হওয়ায় এবং লোহার যন্ত্রাংশসমূহ পুরানো, খুলে পড়া, চুরি হওয়ার কারণে ঝুঁকির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও এই রেলপথে কয়েকটি ট্রেনের ইঞ্জিন, বগি ও রেলপথ দুর্বলতম অবস্থা রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘন কুয়াশার ও বৃষ্টির সময় পাহাড় অতিক্রমকালে ইঞ্জিনের চাকা পিছলে যায়। ফলে মেইল ও মালবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে বালুর বস্তা সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। উঁচু টিলার যে স্থান পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে বস্তা থেকে বালু দেওয়া হয় রেলপথে। অনেক সময় বালিতে কাজ না হলে ট্রেনটিকে পিছনের দিকে ফিরিয়ে নিতে হয়। এভাবে স্বাভাবিক ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। নিয়মিত রেলপথ সংস্কার না করা, রেলব্রিজ ও পাহাড়ি এলাকায় দেয়াল না থাকা, ভারী বর্ষণ, টিলা ধস এসব কারণে লাউয়াছড়া উদ্যান এলাকায় বারবার ট্রেন আটকা পড়ছে। রেলপথের ত্রুটিপূর্ণতার কারণে গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত আড়াইটায় উদ্যানের ভেতরে ১৫৭ নম্বর ব্রিজ এলাকায় মাটি ধসে রেল ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ট্রেন যোগাযোগ ১৩ ঘণ্টা বন্ধ হয়ে পড়ে। ২৩ ফেব্রুয়ারি মালামাল বহনকারী ট্রেনকে ধাক্কা দিয়ে পারাপার করতে গিয়ে কুশিয়ারা ট্রেনের যাত্রা বাতিল হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি মালামাল বহনকারী ট্রেন অতিক্রমের সময় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ২৮ জানুয়ারি সার বহনকারী ট্রেন স্থান অতিক্রম করতে না পেরে পাহাড়ে আটকা পড়ে। ১৭ জানুয়ারি ব্রিজের নিচের মাটি সরে গার্ডার ফেটে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হওয়ায় ২৬ জানুয়ারি সাতগাঁও স্টেশন এলাকায় পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে। এ সময়ে উভয়পাশে একাধিক ট্রেন আটকা পড়ায় হাজার হাজার যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

গত ৭ মে রাতে সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের শমশেরনগর রেল স্টেশনের অদূরে দক্ষিণ পাশে ৩০৬/২ নম্বর রেলপথ বাঁক এলাকায় রেলপথের পাতে ফাটল দিয়ে বারো ইঞ্চি ফাঁক তৈরি হয়। এতে ট্রেনের বড় ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এ সময়ে আব্দুল হোসেন নামে এক স্কুল শিক্ষার্থীর সচেতনতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে হাজারো যাত্রীবাহী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন রক্ষা পায়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সেকশনের সিলেট চট্টগ্রাম পথে দিনে আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেন, রাতে উদয়ন এক্সপ্রেস আপ ডাউন মিলিয়ে চারবার, ঢাকা-সিলেট পথে দিনে আন্তঃনগর পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও রাতে উপবন এক্সপ্রেস আপ ও ডাউন মিলিয়ে আটবার যাতায়াত করছে। রাতে সুরমা মেইল ও জালালাবাদ এক্সপ্রেস নামে দুটি মেইল ট্রেন দুদিক থেকে চারবার চলাচল করছে। সিলেট-আখাউড়া পথে দিনে ও রাতে  কুশিয়ারা প্রতিদিন ১৬টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। তাছাড়া তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও সার বহনকারী মালবাহী ট্রেন চলাচল করে।

শমশেরনগর স্টেশন মাস্টার কবির আহমদ বলেন, ভানুগাছ রেলওয়ে স্টেশন থেকে দুটি পাহাড়ি টিলা অনেক উপরে। শীতকালে আর বৃষ্টির দিনে লাউয়াছড়ায় এ দুটি টিলা অতিক্রম করতে না পেরে প্রায়ই ট্রেন আটকা পড়ে। তিনি আরো বলেন, সিলেট থেকে যখন সারবাহী মাল গাড়ি ও তেলবাহী ট্যাংকার লাউয়াছড়া উদ্যানের পাহাড়ি এলাকায় আটকা পড়ে তখন ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের গণপূর্ত বিভাগের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পথ) মনির হোসেন বলেন, দুর্বল ইঞ্জিনের কারণে এসব টিলা অতিক্রম করতে না পেরে মাঝে মাঝে পাহাড়ে আটকা পড়ে। তিনি আরো বলেন, ট্রেনে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত করা উচিত। লাউয়াছড়া পাহাড়ি উল্লেখযোগ্য দুটি টিলার রেলপথ বৃষ্টি ও কুয়াশার সময় পিচ্ছিল থাকে। তখন বাধ্য হয়ে মেইল ট্রেন ও মালবাহী ট্রেনে রাখা বালু রেলপথে ছিটাতে হয়।