রবিবার রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস বার্ষিক ক্যাথলিক চার্চ কনভেনশনে সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বক্তব্য রাখিতে গিয়া বলিয়াছেন, ‘ইহা পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে যে গণতান্ত্রিক অবস্থা ভালো নাই। আদর্শ এখন প্রলোভনসংকুল হইয়া উঠিয়াছে। কিছু মানুষ নিজেদেরকে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো করিয়া তুলিয়াছেন। রূপকথার বংশীবাদক যেমন শিশুদেরকে ভুলাইয়া চুরি করিয়াছে, সেইরূপ কিছু লোক সাধারণ মানুষকে মোহাবিষ্ট করিতেছে এবং আপনি নিজের আত্মপরিচয় ভুলিয়া যাইতেছেন।’ তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘বিভিন্ন জাতির সংকট’ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।
তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশের কথা বলেন নাই এবং কিছু লোক বলিতে যে তিনি রাজনীতিবিদদের বুঝাইয়াছেন তাহা পরিষ্কার। পোপ একজন সম্মানিত ধর্মীয় গুরু। পোপ এমন একজন মানুষ, যিনি বাণী দেওয়ার অধিকার রাখেন এবং বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টধর্মই নহে, সকল ধর্মের মানুষই মনোযোগ দিয়া শোনেন। ধর্মবিষয়ে উপদেশ প্রদান ও ধর্মীয় আচার পালনই তাহার প্রধান কাজ। সাধারণত রাজনৈতিক পরিস্থিতি লইয়া কথা বলেন না; কিন্তু দেশে দেশে গণতন্ত্র যে সংকটে পতিত হইয়াছে তাহা তিনি স্পষ্টভাবেই উপলব্ধি করিয়াছেন। আমরা জানি না, পোপের এই চিন্তা কেবল তাহার বসবাসের স্থল ইউরোপকে ঘিরিয়া, নাকি উন্নয়নশীল বিশ্বও রহিয়াছে। তবে তিনি ভালো করিয়াই জানেন যে, এই সংকট ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা—সর্বত্রই বিদ্যমান এবং তাহার মাত্রা একেক অঞ্চলে একেক রকম। ইহাও আমাদের ধারণা করিতে দোষ নাই যে, উন্নয়নশীল বিশ্বের অভ্যন্তরে গভীর ক্ষত—সকলটাই তাহার দেখিবার বা জানিবার সুযোগ নাই। যদি দেখিতেন, তাহা হইলে তিনি কী বলিতেন উহা আমাদের কল্পনার বাহিরে।
উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রলুব্ধ শুধু সাধারণ জনগণ হইতেছে না, রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল বিভাগ বিক্রয় হইয়া যাইতেছে লোভ, লালসার নিকট। যাহারা অবৈধ উপার্জিত অর্থ দ্বারা কিনিতেছেন, সেই ক্রেতারা শুধু নির্বাচনি ফলাফলেই প্রভাব রাখিতেছেন না, তাহারা ক্ষমতার রশি পাকাইতে পাকাইতে সাধারণ জনগণের জন্য ফাঁসির রজ্জু তৈরি করিয়া ফেলিয়াছেন। ইহারা যেন মানুষের ভাগ্য নিয়ন্তায় পরিণত হইয়াছেন। নির্দোষীকে দোষী আর দোষীকে নির্দোষ করিবার ক্ষমতাও যেন তাহারা পাইয়া গিয়াছেন। যিনি দেশবিরোধী নহেন, তাহাকে দেশবিরোধী আর দেশবিরোধীকে দেশপ্রেমী সাজাইবার লাইসেন্সও তাহারাই যেন হাতে তুলিয়া লইয়াছেন।
উন্নয়নশীল বিশ্বে যাহারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন তাহারা অনেক কিছুই দেখিতে পান না, ঐ ক্রেতারা তাহাদের অনেক কিছুই দেখিতে দেন না। যেন তাহারাই দেশটাকে ইজারা লইয়াছেন। এই পরিস্থিতি গণতন্ত্র তো দূরস্ত, মানবতারও চরম সংকট ঘনাইয়া আনিতেছে উন্নয়নশীল বিশ্বে। মানুষ একধরনের বন্দিত্ব বোধ করিতেছে। অথচ এই সকল দেশে ঘিকে তৈল আর তৈলকে ঘি বানাইয়া ছাড়িতেছেন যাহারা, তাহাদের কোনো অংশগ্রহণই থাকিবার কথা নহে। এই সংকটের শেষ কোথায় আমরা জানি না। তবে এই রকম পরিস্থিতি তৈরি হইলে ম্যালথাসের তথ্যই অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠে।
ডেমোক্রেসি লইয়া প্লেটো হইতে শুরু করিয়া আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ এবং মনীষীরা অনেক ইতিবাচক এবং নেতিবাচক কথা বলিয়াছেন; কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য বেনিতো মুসোলিনির কথাই দিনে দিনে সত্য হইয়া উঠিতেছে। তিনি বলিয়াছিলেন, গণতন্ত্র তত্ত্বগতভাবে সুন্দর; কিন্তু বাস্তবে একটি প্রহসন। যদিও আমরা বুঝি মুসোলিনির কথা সর্বক্ষেত্রে সত্য নহে, কেবল উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য সত্য হইয়া উঠিতেছে। ইহাকে উন্নয়নশীল বিশ্বের দুর্ভাগ্যই বলা যায়।
