কোনো দেশের উন্নতির পশ্চাতে দক্ষ মানবসম্পদের ভূমিকা সর্বাধিক। আর দক্ষ মানবসম্পদ গড়িয়া তুলিতে হইলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। আমাদের দেশে সঠিক চিকিত্সা লাভের প্রধান অন্তরায় হইল জনবলসংকট। জেলা-উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত দৃষ্টিনন্দন স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়িয়া উঠিলেও দেখা যায় জনবল নাই কিংবা থাকিলেও পর্যাপ্তসংখ্যক নাই। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ইহাই প্রধান সমস্যা। কোনো কোনো এলাকায় এই সংকট আবার প্রবল; যেমন গতকাল পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বরিশাল বিভাগের ৪৬ ভাগ চিকিত্সকের পদই শূন্য। এইখানকার ছয়টি সদর হাসপাতালের পাশাপাশি ৪২টি উপজেলার মধ্যে ৪০টিতে রহিয়াছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এই সকল প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সকের পদ আছে ১ হাজার ২৮১টি। কিন্তু ইহার বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৬৮৮ জন। শূন্য পদ ৫৯৩টি। সাময়িক খালি থাকিলেও কথা ছিল, কোনো কোনো পদ দীর্ঘদিন ধরিয়া শূন্য। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছেন, যাহা মোটেও কাম্য নহে।
বরিশাল বিভাগে চিকিত্সকের সংকটের আদ্যোপান্ত তুলিয়া ধরা হইল একটি দৃষ্টান্ত হিসাবে। প্রকৃতপক্ষে সারা দেশেই এমন চিকিত্সক-সংকট বিরাজমান। প্রতি মাসেই জনবলের তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু এই সমস্যার সহসা সুরাহা হয় না। আমাদের হাসপাতালগুলিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, ভবন, আইসিইউ, সিসিইউ প্রভৃতি থাকিলেও নাই পর্যাপ্ত জনবল। ইহা কেমন কথা? ২৮ হাজার ক্যাডারভুক্তসহ দেশে মোট সরকারি চিকিত্সক আছেন ৩৩ হাজার। দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের চিকিত্সায় সরকারি হাসপাতাল রহিয়াছে ৫৩০টির মতো। এই সকল প্রতিষ্ঠানে একদিকে নতুন পদ সৃষ্টিতে জটিলতা রহিয়াছে, অন্যদিকে বিদ্যমান পদের একটা বড় অংশই শূন্য। নার্স ও টেকনিশিয়ানের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। ইহা কি মানিয়া নেওয়া যায়? শুধু তাহাই নহে, চিকিত্সকদের প্রায় ২১ শতাংশ আছেন ওএসডিতে; অথচ ইহা ১০ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নহে। আমাদের সকল সরকারি হাসপাতাল মিলিয়া শয্যা আছে প্রায় ৭২ হাজার। কিন্তু সিংহভাগ হাসপাতালেই ভর্তি থাকে শয্যার অন্তত দ্বিগুণ রোগী। তাই সীমিত এই জনবলে কীভাবে সঠিক চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব?
এইখানে উল্লেখ্য যে, কোভিড-১৯ মহামারির পর হইতে এই পর্যন্ত ১৫ হাজার চিকিত্সক নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। মোট নার্সের ৬০ শতাংশও নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে এই সময়ে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে স্বাস্থ্য খাতে এখনো জনবলের সংকট বিদ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) আদর্শ মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য এক জন চিকিত্সক দরকার। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ধরিলে আমাদের চিকিত্সক দরকার ১ লক্ষ ৬০ হাজার। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি মিলাইয়া রহিয়াছেন ১ লক্ষ ২০ হাজার; অর্থাত্ প্রতি ১ হাজার ৪১৭ জনের বিপরীতে আছেন এক জন চিকিত্সক। এইখানে প্রশ্ন, স্বাস্থ্যসেবার মতো জরুরি খাতে কেন বত্সরের পর বত্সর চিকিত্সক, নার্স বা টেকনিশিয়ান-সংকট থাকিবে? কেননা ইহার ক্ষতিটার প্রভাবটা সরাসরি পড়ে জনগণের ওপর। মানুষ অসুখ-বিসুখে ভুগিতে থাকিলে তাহার দ্বারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব?
এইদিকে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, মামলার খড়্গ ও কালক্ষেপণের কারণেও এই সংকট দিনদিন বাড়িতেছে। চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, বেশির ভাগ নিয়োগ শেষ হইতেই লাগে চার-পাঁচ বত্সর। ইহারই-বা সমাধান কোথায়? আমরা মনে করি, এই ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়, পিএসসি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর-অধিদপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করিয়া এই ব্যাপারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। স্বাস্থ্য খাতের অর্গানোগ্রামও হালনাগাদ করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। কেননা জনসংখ্যা বাড়িবার কারণে নতুন জনবলকাঠামোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বর্তমানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী উভয়েই চিকিত্সক। অতএব, আমরা আশা করি, তাহারা এই মন্ত্রণালয়ের জনবল বৃদ্ধিতে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করিবেন।
