কোরবানিতে হয়রানির অবসান প্রয়োজন

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৪, ০২:০০

এই তো দেশে কিছুদিন আগেই পালিত হলো ঈদুল আজহা। লক্ষণীয়, মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে কোরবানিদাতার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। কোরবানির ১০-১৫ দিন আগে থেকে ক্রেতারা এক হাট থেকে অন্য হাটে দৌড়াতে থাকেন একটু সুবিধাজনক দামে পশু কেনার জন্য। কিন্তু ভোগান্তি যেন নিত্য সাথি! অন্য সময় ক্রেতারা গরুর গোশত কেনেন ৭৫০-৮০০ টাকায়, খাসির গোশত ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়। স্বাভাবিকভাবে একটা জীবন্ত গরু বা খাসি কিনলে দাম সেই তুলনায় কম হওয়ার কথা; কিন্তু বিধি বাম। কোরবানির জন্য পশু কিনতে গেলে ব্যাপারী ভাইয়েরা যে দাম হাঁকিয়ে থাকেন, তা ওপরের দামকেও হার মানায়। মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কসাই ভাইয়েরা কি বিনা লাভে আমাদের গোশত খাওয়ান? কোরবানির পশুর হাটে আরেক অত্যাচারের শিকার হতে হয় দালালদের খপ্পড়ে পড়ে। দালালদের দৌরাত্ম্য এতো বেশি যে তাদের মাশোহারা না দিয়ে আপনি পশু কিনতেই পারবেন না। বিনা পুঁজিতে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা পাবলিকের পকেট কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এবার আসি পশু কেনার পর খাজনার বিষয়ে। খাজনা খাসি বা ছাগলপ্রতি ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা আর গরুপ্রতি ১ হাজার থেকে ৫-৬ হাজার টাকা। আমার এই হিসাব মফস্সলের। জানি না, বড় বড় শহরের অবস্থা কী? কসাইদের জন্য গুনতে হয় অনেক বড় অঙ্কের টাকা। ফলে কোরবানি শেষে দেখা যায় কিনে খাবার সময় যে দামে কিনতে হয়, আস্ত গরু আর খাসিতে তার থেকেও অনেক অনেক বেশি দাম পড়ে যায়।

পশুতে কত কেজি গোশত হতে পারে সে বিষয়ে আগেই ধারণা করা সম্ভব। সাধারণ ক্রেতারা অধিকাংশই সেই পদ্ধতি জানেন না। আবার জানলেও বাজারে গিয়ে ওভাবে মেপে নেওয়ার সময় হয় না বা সমাজও মেনে নিতে চাইবে না। অনেকে কটু কথা বলবে বা খারাপ দৃষ্টিতে দেখবে; এই ভয় তো আছেই। এবার আমাদের হুজুরেরা মাসআলা দিয়ে দিয়েছেন যে, পশুর মালিককে জিজ্ঞাসা করা যাবে না যে, কত কেজি গোশত হতে পারে, তাহলে নাকি কোরবানি হবে না। আর পশুর মালিকেরা এই সুযোগ নিয়ে যে পশুর প্রকৃত ওজন তিন মণ, সেটাকে বলছেন চার বা সাড়ে চার মণ গোশত হবে! এজন্য যে কোনো পশু বাজারে প্রবেশের আগে নিয়মানুযায়ী সঠিকভাবে গোশতের পরিমাপ করে গায়ে সিলমোহর লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য পশু কেনা বা দামাদামি করা সহজ হবে বলে মনে করি।

কোরবানির মাসখানেক আগে থেকে অসত্ ব্যবসায়ীরা পশু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট খাইয়ে দ্রুত ওজন বাড়াচ্ছেন, যার গোশত শরীরের জন্য ক্ষতিকর বলে বিজ্ঞ চিকিত্সকবৃন্দ মনে করেন। এক্ষেত্রে মোটাতাজাকরণের উদ্দেশ্যে পশু দ্রুত ক্ষতিকারক উপাদান সেবন করেছে কি না, সে বিষয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে পশুকে বাজারে ঢোকানোর অনুমতি দিতে হবে।

বাজার থেকে ফড়িয়া বা দালালদের উচ্ছেদ করার ব্যবস্থা হাতে নিতে হবে। না হলে সাধারণ ক্রেতারা হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির স্বীকার হচ্ছেন। আধুনিক যুগে এই দালালদের কোনো প্রয়োজনই নেই। খাজনার জন্য যেমন খুশি তেমন রেট নয় বরং গ্রাম, উপজেলা, জেলা ও বিভাগভিত্তিক রেট নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। না হলে যেমন ইচ্ছা তেমন রেট নির্ধারণ করে ক্রেতাদের ঠকানো হচ্ছে।

কোরবানির গোশত বিতরণ আরেক বিড়ম্বনা তৈরি করে। বিতরণ পদ্ধতি হতে হবে নিরপেক্ষ ও কলুষমুক্ত। কোরবানিদাতারা তাদের সঙ্গে কোবানির পশুর গোশত প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যোগাযোগ করলে তারাও পারিশ্রমিক দাবি করেন সীমাহীন আর গোশত চুরি করার ঘটনা তো নিত্য ব্যাপার। কাজের আগে তারা শুনে নেন কত টাকা দামের পশু। সে হিসাবে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পারিশ্রমিক হাঁকিয়ে দেন। এজন্য সবকিছুই যদি শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়, তাহলে সবাই একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন।

আমরা বাজারে একটু ভালো মানের চামড়ার জুতা বা স্যান্ডেল কিনতে গেলে দাম শুনে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়। এসব জুতা বা স্যান্ডেলের প্রধান কাঁচামাল হলো পশুর চামড়া। বছরের সিংহভাগ পশুর চামড়া সংগৃহীত হয় কোরবানির সময়। চামড়া ব্যবসায়ীরা জানেন, সাধারণ কোরবানিদাতাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ফলে তারা যে দামই নির্ধারণ করুক না কেন, সে দামেই চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য। সিন্ডিকেটের ওপর বিরক্ত হয়ে তারা যদি চামড়া বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কোরবানির চামড়া খাওয়া শুরু করেন, তাহলে দেশের চামড়াশিল্পে বড় ধস নামতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখে হয় চামড়াজাত দ্রব্যের দাম কমাতে হবে, নতুবা কোরবানির পশুর চামড়ার প্রকৃত ও পর্যাপ্ত দাম নির্ধারণ করে গরিবের হক গরিবকে দিতে হবে।

সরকার, প্রশাসন, হাট কর্তৃপক্ষ, কোরবানিদাতা ও সর্বসাধারণ সবাই যদি আন্তরিক হই, তবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোরবানি সম্পন্ন সম্ভব হবে, দূর হবে হয়রানি। কেউ তার হক থেকে বঞ্চিত হবেন না।

লেখক: প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি ফুলতলা মহিলা কলেজ, খুলনা

ইত্তেফাক/এমএএম