তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে ইন্টারনেট আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হইয়া উঠিয়াছে। শিক্ষাব্যবস্থায়ও ইন্টারনেট এখন একটি অপরিহার্য মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের তথ্যের সহজলভ্যতা, দূরশিক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে যোগাযোগ সহজতরকরণ ও শিখন পদ্ধতিতে ইন্টারনেটের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্দেশ্যে সরকারিভাবে নানান ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হইয়াছে। তবে দুঃখের বিষয় হইল, কোটি কোটি টাকা খরচ করিয়া যাহাদের উদ্দেশ্যে এই সমস্ত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হইতেছে, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রত্যাশিত সুফল হইতে বঞ্চিত হইতেছেন সেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ কলেজ ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট সংযোগ নাই, আর ৪০ শতাংশ ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট থাকিলেও অতিরিক্ত ধীর গতিসম্পন্ন ও বারংবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে কাজ চালাইয়া যাইবার অবস্থায় নাই।
২০২০ সালে দেশের ৫৮৭টি সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়াছিল বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। দুই বত্সর মেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিতে দক্ষ করিবার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছিল। ইহাতে খরচ হইয়াছিল প্রায় ৪৬ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা; কিন্তু পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় মাত্র তিন বত্সরের ব্যবধানে হোঁচট খায় ইন্টারনেট সংযোগের প্রকল্পটি। এখন অধিকাংশ কলেজেই বিটিসিএলের ইন্টারনেট সংযোগ নাই। যেইখানে সংযোগ রহিয়াছে, সেইখানে নাই গতি। কিংবা যন্ত্রপাতি নষ্ট হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে বত্সরের পর বত্সর। ইহাতে এই প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্যই মাঠে মারা গিয়াছে। অথচ ইহা একটি ভালো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কত টাকাই বা লাগে! ইহা ছাড়া যে কোনো প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে তাহার মেয়াদ বাড়ানোও দরকার। ইহাছাড়া সরকারি কলেজের জন্য যেই বাজেট রহিয়াছে এবং শিক্ষার্থীদের বেতন হইতে আয়-ইনকাম রহিয়াছে, সেখান হইতেও কেন মেরামতের জন্য কিছু অর্থ ব্যয় করা হইবে না? কলেজ কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ফান্ড হইতে সেই মেরামতের ব্যয় বহন করিয়া পরবর্তী সময়ে তাহা সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস হইতে আদায়ে দেনদরবার করিতে পারেন বা বিদ্যমান যে প্রক্রিয়া আছে তাহা অনুসরণ করিতে পারেন; কিন্তু তাহা না করিয়া শিক্ষার্থীদের সেবাদানে কেন এই গাফিলতি ও অবহেলা প্রদর্শন? কলেজ প্রধান বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাহাদের দায়িত্ব এড়াইয়া যাইতে পারেন না।
আমাদের বক্তব্য হইল, সামান্য অর্থের জন্য জরুরি সেবা কেন বন্ধ থাকিবে? শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট-সুবিধা যে কোনোভাবেই হউক নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখিতে হইবে। কেননা আজকাল ইন্টারনেট শিক্ষা অর্জনের শুধু একটি মাধ্যম নহে, এই মুহূর্তে ইহা শিক্ষাব্যবস্থার অত্যাবশ্যকীয় অধ্যায় হইয়া উঠিয়াছে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে এই ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হইবে। শিক্ষার আধুনিক উপকরণ সহজলভ্য করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া অনলাইন লাইব্রেরি ওয়ার্ক ও গবেষণার জন্য ইন্টারনেট অপরিহার্য। দেশের সরকারি কলেজগুলিতে অকেজো যন্ত্রপাতি ও দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কারণে দূরশিক্ষণ, গবেষণা, অনলাইন মূল্যায়ন ইত্যাদি কার্যক্রম ব্যাহত হইতে থাকিবে তাহা কাহারও কাম্য হইতে পারে না। আজিকার পৃথিবীটা পরিণত হইয়াছে এক গ্লোবাল ভিলেজে। তাই আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সহিত প্রতিযোগিতায় পিছাইয়া না পড়ুক। গ্রাম ও শহরের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তিগত যে বৈষম্য ও পার্থক্য এখনো রহিয়া গিয়াছে, একই কারণে তাহারও অবসান একান্ত কাম্য।
অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলিতে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি ইনস্টল ও ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করাই সরকারের কর্তব্য হইতে পারে না, সেইগুলিকে প্রয়োজনীয় তদারকির মাধ্যমে রক্ষাণাবেক্ষণ করিয়া কার্যকর রাখাও প্রকল্পের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। আবার বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া সরকারি প্রকল্পের অর্থের আশায় বসিয়া না থাকিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকেও নিজস্ব অর্থে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগ লইতে হইবে। যাহাতে শিক্ষার মান উন্নত হয় এবং শিক্ষার্থীরা তাহাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াইতে পারে। শিক্ষার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করিতে আমাদের যাহা করণীয় তাহাই করিতে হইবে, নতুবা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হইবে না।
