বাংলাদেশের গডফাদার কালচার

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৮:২০

বর্তমানে অপরাধ জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বুঝাইতে ‘গডফাদার’ বহুল ব্যবহূত একটি শব্দ। এই শব্দটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করিয়াছিল মূলত ১৯৬৯ সনে প্রকাশিত মারিও পুজোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য গডফাদার’ এবং সেই উপন্যাসের উপর ভিত্তি করিয়া ১৯৭২ সনে নির্মিত ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা পরিচালিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের সাফল্যের পর বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশন মিডিয়া ‘গডফাদার’ শব্দটি ব্যবহার করিতে শুরু করে। এখন শব্দটি শুধু অপরাধজগতের নেতা হিসাবে নহে, বরং একজন শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতীক হিসাবেও ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশেও এই শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হইয়া আসিতেছে।

গডফাদার উপন্যাসটি মূলত একটি ইতালীয়-আমেরিকান মাফিয়া পরিবারের গল্প, যেইখানে ভিটো কর্লেওনে চরিত্রটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কর্লেওনে একজন শক্তিশালী মাফিয়া বস, যাহার নৈতিকতা ও আচার-আচরণ তাহাকে সমাজের একজন শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রতিপন্ন করে। উল্লেখ্য, ইতালিতে মাফিয়া এবং গডফাদারদের দৌরাত্ম্য ছিল ভয়াবহ আকারের। বাংলাদেশে গডফাদার হিসাবে যাহাদের উত্থান হইয়াছে, তাহারা প্রধানত তাহাদের অপরাধজগতে সক্রিয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। মারিও পুজোর ‘গডফাদার’ এবং বাংলাদেশের বাস্তব জীবনের অপরাধীদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য খুঁজিয়া পাওয়া যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষমতা অর্জন ও তাহা ধরিয়া রাখিবার জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। গডফাদার উপন্যাসের কর্লেওনে পরিবার যেমন মাফিয়া সাম্রাজ্য পরিচালনা করে, তেমনি বাংলাদেশের অপরাধীরা সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, হত্যাকাণ্ড, গুম ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে তাহাদের নিজস্ব ক্ষমতার বলয় তৈরি করিয়া থাকেন। উভয় ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। ‘গডফাদার’ উপন্যাসের কর্লেওনে পরিবার যেমন রাজনৈতিক এবং ব্যাবসায়িক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে, তেমনি বাংলাদেশের অপরাধীরাও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করিবার চেষ্টা করে। ভিটো কর্লেওনে ও তাহার অনুসারীরা যেমন প্রয়োজনে হত্যা করিতে দ্বিধা করে না, তেমনি বাংলাদেশের অপরাধীরাও রাজনৈতিক বিরোধ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও জমিজমাসংক্রান্ত কোন্দলের বিহিত করিতে সহিংসতা ও হত্যার পথ বাছিয়া লয়।

অবশ্য ভিটো কর্লেওনে ও বাংলাদেশের তথাকথিত গডফাদারদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রহিয়াছে। এই দেশের অপরাধীদের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার লড়াই, এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা প্রাধান্য পায়। তাহারা জনগণের সেবা বা ন্যায়বিচারের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে না। তাহাদের কর্মকাণ্ড শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিজ স্বার্থে জনগণকে ভীতিপ্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে ভিটো কর্লেওনের নিকট নৈতিকতা ও মূল্যবোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাহার কর্মকাণ্ডের মধ্যে ন্যায় ও মানবিকতা প্রাধান্য পায়, যাহা তাহাকে শুধু একজন মাফিয়া বস নহে, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে তুলিয়া ধরে। বাংলাদেশের গডফাদারদের মধ্যে নৈতিকতার অভাব প্রকট। তাহাদের কর্মকাণ্ডে মানবিকতার কোনো স্থান নাই। তাহারা শুধু ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করে, যাহা সমাজে ভীতি এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। উপন্যাসের গডফাদার মাফিয়া-সম্পর্কিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিলেও বাংলাদেশের গডফাদারদের কর্মকাণ্ডের পরিধি অনেক বিস্তৃত। তাহারা হত্যা, গুম, মাদক চোরাচালান ছাড়াও এমন সমস্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সহিত জড়িত, যাহা সাধারণ মানুষের জন্য সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব করিয়া তুলিতেছে।

মুশকিল হইল, বাংলাদেশের তথাকথিত গডফাদাররা পরিণত নহে। মারিও পুজোর ‘গডফাদার’ উপন্যাসের চরিত্র ভিটো কর্লেওনে তাহার নৈতিকতা, পরিবারপ্রেম, এবং ব্যক্তিগত নীতির জন্য সম্মানিত। ইহার বিপরীতে, বাংলাদেশের গডফাদাররা সমাজের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে এবং শুধু সংকীর্ণ স্বার্থই তাহাদের কাছে প্রাধান্য পায়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অপরাধীদের দমন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি পদক্ষেপ না করিলে ভবিষ্যতে দেশের সবাইকে ইহার চরম পরিণতি ভোগ করিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন