জীবনে উন্নতি লাভ করিতে হইলে লেখাপড়া করিবার তথা শিখিবার কোনো বিকল্প নাই। জীবন-জীবিকার তাগিদে এবং প্রকৃত মানুষ হইয়া উঠিবার জন্য আমাদের আজীবন জানাশুনার মধ্যে থাকিতে হইবে। এই জন্য ইসলাম ধর্মে বলা হইয়াছে, উতলুবুল ইলমা মিনাল মাহাদি ইলাল লাহাদি। অর্থাত্ দোলনা হইতে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন কর। তবে আমরা যেই জ্ঞান বা শিক্ষা অর্জন করি না কেন, তাহা যেন বাস্তবানুগ হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যাহাতে বাস্তব জীবনের সহিত তাহার সাদৃশ্য থাকে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সহিত বাস্তবের মিল নাই—এই কথা আমরা ঢালাওভাবে বলিতে চাহি না। শিক্ষাব্যবস্থা লইয়া স্বাধীনতা লাভের অর্ধশতাব্দীকাল পরেও নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চলিতেছে। সাম্প্রতিক কালে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষা কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করা হইয়াছে। ইহা লইয়াও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলিতেছে। পরীক্ষাপদ্ধতি লইয়াও প্রশ্ন উঠিয়াছে। বিশেষ করিয়া অনলাইন তথা ইউটিউবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অনেকের মনে তৈরি হইয়াছে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা। তবে ইহার মধ্যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তব জীবনের সহিত একীভূত করিবার যে কোনো উদ্যোগ নাই, তাহা বলা যায় না। তবে দিন শেষে ইহার সাফল্য নির্ভর করে সকলের সচেতনতা ও আন্তরিকতার উপর। আমাদের দেশে এখনো দেখা যায়, পঠিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সহিত মিলাইয়া নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রথিতযশা ও সফল ব্যক্তিদের ক্লাসে ডাকিয়া আনিয়া শিক্ষার্থীদের সম্মুুখে তাহাদের লেকচার দেওয়ার সুযোগ করিয়া দেওয়া হয়। বিভিন্ন শিল্পকলকারখানা কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে হাতেনাতে শিক্ষা দেওয়ার জন্য রহিয়াছে ইন্টারনির ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সফরেরও প্রধান উদ্দেশ্য, তাহাদের বাস্তব জ্ঞানের সহিত পরিচয় করিয়া দেওয়া। বিশেষত সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষাকে বাস্তব জীবনের সহিত মিলাইয়া দেখিবার সুন্দর ব্যবস্থা রহিয়াছে। যদিও বেসামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ইহাকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ইহার পরও পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা হইতে বাহির হইবার একধরনের প্রচেষ্টা বিদ্যমান। মোদ্দাকথা, আমরা যেই শিক্ষাই অর্জন করি না কেন, বাস্তব জীবনে তাহা যেন কাজে লাগে।
প্রাচীন মিশরীয় ও মেসোপটেমীয় সভ্যতায় যে শিক্ষা দেওয়া হইত, তাহার সহিতও জীবনের সংযোগ ছিল। বিজ্ঞান, চিকিত্সা, গণিত ও জ্যামিতির মতো ব্যাবহারিক বিষয়গুলি ছিল শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। ছিল স্থাপত্যবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা ও ভাস্কর্যশিল্পের মতো পেশামূলক শিক্ষাও। স্পার্টায় ছেলেদের যুদ্ধবিদ্যা শেখানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হইত। গ্রিক ও রোমান শিক্ষাব্যবস্থায় জনপরিসরে অংশগ্রহণ এবং নাগরিক দায়িত্বের উপর জোর দেওয়া হইত। এমনকি ১৪০০ এবং ১৫০০ শতাব্দীর মুসলিম শাসনাধীন দিল্লিতে যে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সেইখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ছিল গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিত্সাবিজ্ঞান, স্থাপত্যবিদ্যা, প্রকৌশলবিদ্যা ইত্যাদি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা। বলা বাহুল্য, জীবনসম্পর্কিত শিক্ষার প্রসার ঘটাইতে হইলে শিক্ষার্থীদের মনে জানিতে চাওয়ার আগ্রহ ও তৃষ্ণা জাগাইয়া তুলিতে হইবে। ইহাই শিক্ষকদের অন্যতম প্রধান কাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাহার ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, ‘কতবার চেষ্টা করেছি আমাদের ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতে; কিন্তু দেখতে পাই তাদের মনে কোনো প্রশ্নও নেই। জানতে চাওয়ার সঙ্গে জানতে পাওয়ার যে যোগ আছে সে যোগ ওদের বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’ এই বিচ্ছিন্নতাই বাস্তবমুখী শিক্ষার প্রধান অন্তরায়।
অন্যদিকে আমরা আমাদের শিক্ষা কারিকুলামকে যতই ঢালিয়া সাজাই না কেন, শিক্ষক সমাজকে যতই প্রশিক্ষিত করি না কেন, যদি সমাজে সেই শিক্ষার প্রয়োগ ও কদর না থাকে, তাহা হইলে তাহার মূল্য কোথায়? সেই ষাট দশক হইতে আমরা শুনিয়া আসিতেছি, লেখাপড়া শিখিবার পর কোনো চাকুরি-বাকুরি পাইতে হইলে টাকা ও মামার জোর লাগে। এখনো আমরা এমনই শুনিতে পাই। এমনকি চারিদিকে যেই সকল খবর প্রকাশিত হইতেছে, তাহাতে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হইয়া গিয়াছে। সামান্য একটা চাকুরি পাইতে এত কাঠখড় পুড়াইতে হয়? এত তদবির ও টাকাপয়সা লাগে? তাহা হইলে একজন শিক্ষার্থীর নীতিনৈতিকতার জ্ঞান অর্জন করিয়া কী লাভ? অর্থাত্ শিক্ষাব্যবস্থাকে যেমন বাস্তবধর্মী হইতে হইবে, নৈতিকতা ও মানবিকতাবোধসম্পন্ন হইতে হইবে, তেমনি আমাদের সমাজেও তাহার প্রতিফলন থাকা আবশ্যক। নতুবা শিক্ষার্থীরা কনট্রাডিকশন বা বৈপরীত্য লইয়া বাড়িয়া উঠিবে এবং তাহাই একসময় তাহাদের মনে তৈরি করিবে গভীর হতাশা।
