পবিত্র আশুরার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৪, ১৩:৫২

হিজরি সালের প্রথম মাস মহরমের দশম দিনকে বলা হয় আশুরা। আরবি ‘আশারা’ শব্দের অর্থ দশ আর ‘আশুরা’ অর্থ দশম। মহরম মাসের ১০ তারিখে তাত্পর্যবহ অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে বিধায় এই দিনকে আশুরা নামে অভিহিত করা হয়। সমগ্র মুসলিম জাহানে এই দিবসটি গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। রোজা পালনের পাশাপাশি নফল ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে উদ্যাপন করা হয় বলিয়া এই দিবসটির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত এই দিনের রোজা সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) হইতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ্ (স.) আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেই রূপ গুরুত্ব প্রদান করিতেন, অন্য কোনো রোজা সম্পর্কে সেই রূপ গুরুত্বারোপ করিতেন না। (সহিহ বুখারি ১/২১৮)।

পবিত্র আশুরার এই দিনে পৃথিবীতে অনেক তাত্পর্যমণ্ডিত ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে। আল্লাহ তায়ালা আকাশ-জমিন-পাহাড়-পর্বতসহ সমস্ত পৃথিবী এই দিনে সৃষ্টি করেন। আদি মানব হজরত আদম (আ.) এই দিনে পৃথিবীতে আগমন করেন, এই দিনই তাহার তওবা কবুল করা হয় এবং তিনি স্ত্রী হাওয়া (আ.)-এর সহিত আরাফার ময়দানে সাক্ষাত্ লাভ করেন। এই দিনে হজরত নূহের (আ.)—জাহাজ মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে আসিয়া স্থির হয় (মুসনাদে আহমদ)। হজরত ইবরাহিম (আ.) আশুরার দিনে নমরুদের প্রজ্বলিত আগুন হইতে মুক্তি লাভ করেন। আবার আল্লাহ তায়ালা এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও তাহার উম্মতকে মুক্তি দেন এবং ফেরাউন ও তাহার বাহিনীকে পানিতে ডুবাইয়া ধ্বংস করেন (মুসলিম)। এই দিনে হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট হইতে পরিত্রাণ লাভ করেন এবং হজরত ঈসা (আ.)কে আসমানে উঠাইয়া লওয়া হয়। এই সকল তাত্পর্যবহ অসংখ্য ঘটনার কারণে পৃথিবীর আদি যুগ হইতে পবিত্র আশুরা একটি অবিস্মরণীয় দিন। এই দিন পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামও রোজা পালন করিতেন। এমনকি রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে উম্মতে মুহাম্মদির উপর আশুরার রোজা ফরজ ছিল। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা নফল রোজায় পরিণত হয়।

আশুরার দিনে যত মহান ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে, সকলই গোটা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয় ও আশীর্বাদস্বরূপ। আর ইহার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সিয়াম বা রোজা পালন করা উত্তম। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলিয়াছেন, ‘লাইন শাকারতুম লাআজিদান্নাকুম’। অর্থাত্ তোমরা যদি শুকরিয়া আদায় করো, তাহা হইলে আমি অবশ্যই­ আমার নেয়ামত বৃদ্ধি করিয়া দিব (১৪ঃ৭)। আমরা জানি, ইহুদিরা কেবল আশুরার দিনেই সিয়াম পালন করিতেন। প্রিয়নবি (সা.) তাহাদের ইবাদত-বন্দেগির সহিত ইসলামি ইবাদতের স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত করিবার নিমিত্তে আশুরা দিবসের সহিত নবম দিবসেও সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়াছেন। খিলাফতে রাশিদা পর্যন্ত সমগ্র উম্মাহর মধ্যে বরকতময় এই দিনটির তাত্পর্য ও মর্মবাণী উল্লিখিত ঘটনাবলির ভেতরই সীমাবদ্ধ ছিল; কিন্তু ৬১ হিজরির এই দিনটিতেই রসুলে আরাবি প্রিয় নবি (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমা (রা.)-এর কলিজার টুকরা হজরত হুসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মম ও নৃশংসভাবে শাহাদতবরণ করেন। এই হূদয়বিদারক ঘটনাটি উল্লিখিত সকল ঘটনাকে ছাপাইয়া উঠে এবং দিনটিকে শোকাবহের আবর্তে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করে। তবে ৬১ হিজরিতে কারবালার ঘটনা ঘটিলেও ইহা শোক দিবস হিসাবে উদ্যাপন শুরু হয় ৩৫২ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা আমির মু’ইযযুদ্দৌলার আমলে।

মূলত পবিত্র আশুরার দিনের শিক্ষা হইল, সকল অবস্থায় আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করিতে হইবে। তাহার কৃপা বা অনুগ্রহ ছাড়া আমাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নহে। অন্যদিকে ইমাম হুসাইনের আদর্শ অনুসরণ করিয়া সত্য ও ন্যায়ের পথে সর্বদা অবিচল থাকিতে হইবে। তাহার খুনিদের অনুসারীরা বিশ্বের নানা প্রান্তে আজও নিত্য নূতন কারবালার জন্ম দিয়া চলিয়াছে। এই মুহূর্তে ফিলিস্তিন তাহার জ্বলন্ত উদাহরণ। এইভাবে যুগে যুগে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত মানুষকে কারবালা পথ দেখাইয়া আসিতেছে। অন্যায়-অনিয়ম ও জুুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ানোই শহিদে কারবালার মূল শিক্ষা। তবে এই দিন সকল প্রকার শিরক ও বিদআত হইতে মুক্ত থাকাও একান্ত কর্তব্য।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন