বাংলাদেশে সহিংসতার বলি ঘুরেফিরে সেই নারীই

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪, ১৯:৩৬

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় সংঘাত-সহিংসতার ইতিহাস লেখা হয়ে গেল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি পেশার শত শত মানুষের জীবন ঝরে গেল রাজপথে। পঙ্গুত্ববরণ করলেন হাজারো শিক্ষার্থী। এসবের ভিড়েও নারীর প্রতি সহিংসতার কিছু চিত্র আলাদা করে দৃষ্টি কেড়েছে সচেতন মহলের। মেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি হিংস্র আচরণ করেছেন সরকার সমর্থক রাজনৈতিক শক্তিবলয়ে থাকা ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এমনকি বিক্ষোভকারীরাও ক্ষোভ মিটিয়েছে ছাত্রলীগের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর। যেসব দৃশ্য বলে, হাজার বছর ধরে লালিত বাঙালি পুরুষের মনজগতের চিত্র।

১৪ জুলাই থেকে উত্তপ্ত বাংলাদেশের রাজপথ। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কার চেয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে আনাচেকানাচে। এতে অংশ নিয়েছেন নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণ গেছে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের। বাদ যায়নি নারী ও শিশুরা। আন্দোলনের শুরুতে একটি ছবি নজর কেড়েছিল সবার। তাতে আরও তীব্র হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা। ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর এক যুবক লাঠি হাতে দুই তরুণীকে মারতে উদ্যত হয়েছেন। ওই যুবক ক্ষমতাসীন দলের কর্মী বলে জানা গেছে। তাকে দেখে নিরস্ত্র তরুণীরা ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছেন। চেহারায় আতঙ্ক অনিশ্চয়তা। তারা আত্মরক্ষার্থে সামনে বাড়িয়েছেন দুটি হাত। এই ছবিটি জন্ম দেয় হাজারো প্রশ্নের। সেই সঙ্গে প্রমাণ হয়, শারীরিক শক্তিতে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা নারীদের প্রতি বাঙালি পুরুষের অন্যায় প্রহারের ইতিহাস। যা চলছে হাজার বছর ধরে।

টানা চতুর্থ মেয়াদে দেশ শাসন করছে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি দাবি করা আওয়ামী লীগ। এই দলের স্লোগান থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও সবসময় বলা হয় প্রগতিশীলতার কথা। তারা মুক্তমতের পক্ষে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানায়। দেশের শিল্প-সংস্কৃতির আশ্রয়স্থল বলেও ধরা হয় তাদের। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা দলটি ক্রমাগত প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্ধে মানুষের বাক-স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সব কার্যক্রমই নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে তারা। এজন্য তারা সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮, পরে সমালোচনার মুখে সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৩ পাশ করেছে। এসব আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের। আর দলটির যুব ও ছাত্র সংগঠন চলমান আন্দোলনে লাঠি হাতে তুলে নিয়েছে তাদেরই সহপাঠীদের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের হামলার শিকার হচ্ছেন তাদেরই বন্ধু-বান্ধবীরা। যা কখনোই কাম্য ছিল না দেশের সবচেয়ে প্রাচীণ এই ছাত্র সংগঠনের কাছ থেকে। তাদের হাতে কোনো নারী লাঞ্ছিত হবে, এটাও চরম হতাশার কথা। অথচ সেইসব চিত্র এখন প্রতিনিয়ত দেখতে হচ্ছে আমাদের।


বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। সেসময় নারীদের সম্মানহানি করতে দেশের মৌলবাদী গোষ্ঠী বাতাসে ছড়িয়েছে কূকথা। এবার সরকার সমর্থক গোষ্ঠী সেই নারীকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছুড়ছে গুলি। চলমান সংঘাত-সংঘর্ষে এই মানুষকে আর কখনোই প্রাণ দিতে হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে এটা আমাদের জন্য চরম হতাশার। সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীদের বড় সংখ্যাও।

দেশের সংঘর্ষ-সংঘাতে অর্থনৈতিক ক্ষতিও গুনতে হয় নারীদেরই বেশি। পুরুষ তার কাজকর্ম কিছুটা করতে সক্ষম হলেও দেশে হাত গুঁটিয়ে নিতে হয় নারীদের। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি নারীর কর্মস্থল পোশাক কারখানা। সংঘর্ষের মুখে এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কর্ম হারানোর ঝুকিতেও পড়তে হচ্ছে নারীদের। আর নারীদের এসব ক্ষতি পুষিয়ে দিতে রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি মো. নাসির উদ্দিন জানান, প্রায় ৩০০ পোশাক কারখানা বন্ধ আছে। বন্ধ কারখানাগুলোর মধ্যে আশুলিয়া এলাকাও রয়েছে। এসব কারখানার নারী পোশাকশ্রমিকদের পড়তে হবে অসহনীয় কষ্টের মধ্যে।

রাজধানী ঢাকার পথে পথে হকারি করে জীবনধারণ করেন হাজার হাজার নারী। এই সহিংসতায় ক্ষতির মুখে পড়েছে তাদের রুটি-রুজিও। অনেকেই ঘর থেকে বের হতে পারেননি। কেউ কেউ বের হলেও শিকার হয়েছেন হামলা-সংঘাতের। এ অবস্থায় নারীরা রাষ্ট্রীয় তদারকি না পেলে দুঃসহ হয়ে উঠবে তাদের জীবন

ইত্তেফাক/আরডি