গণতান্ত্রিক দেশেই বাকস্বাধীনতা ও মানবমর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৪, ১৩:১৫

'আমার কর্ণধার আমি। আমার পথ দেখাইবে আমার সত্য।' বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অগ্নিবাণী আমরা কতটুকু 'মেনে নিয়েছি' আর কতটা 'মনে নিয়েছি', তাহা এক কঠিন প্রশ্ন বটে! কারণ, আজিকার সমাজেও প্রায়শ শুনিতে পাওয়া যায় সেই পুরাতন প্রবচন- 'সত্য কথার ভাত নাই'। সত্য বলিবার পরও যখন কথার মারপ্যাঁচে পড়িয়া মিথ্যা জিতিয়া যায়, তখন আমরা দুঃখ ও খেদ প্রকাশ করিতে এই ধরনের নানা কথা ব্যবহার করিয়া থাকি। যদিও বিভিন্ন সমাজে সেই খেদ প্রকাশের সুযোগও নাই। কখনো-বা পরিস্থিতি এমনও হয়, খেদ প্রকাশ দূর কা বাত, সত্য যদি প্রভাবশালীদের বিপক্ষে যায়, তাহা হইলে আর রক্ষা নাই! দুঃখজনক হইলেও সত্য, এই কারণে শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রায় সময় উপদেশ দিয়া থাকেন, 'সকল সময় সকল জায়গায় সত্য কথা বলিতে নাই।' এহেন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠিতে পারে, আমরা কি তাহা হইলে আর সত্য বলিব না, সত্য সমাজ হইতে উঠিয়া যাইবে? অবশ্যই নহে। পৃথিবীতে যত সমৃদ্ধির ইতিহাস রহিয়াছে, যত অগ্রযাত্রার মহাকাব্য রচিত হইয়াছে, তাহা সত্যের উপর ভর করিয়াই হইয়াছে। সত্য সর্বদাই 'সত্য', সত্যের কোনো রকমফের নাই। সত্যের এই চর্চায় স্বভাবতই চলিয়া আসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রসঙ্গ। ইহার সহিত চলিয়া আসে মানবমর্যাদার বিষয়টিও।

এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যেই সম্প্রতি বাকস্বাধীনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা প্রত্যক্ষ করিলাম বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ী প্রার্থীদের শপথবাক্য পাঠ করা লইয়া রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মধ্যে বাগযুদ্ধের অবতারণা ঘটে, যাহা গিয়া পৌঁছায় কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত। এই ঘটনায় মহামান্য হাইকোর্ট বলিয়াছেন, রাজ্যপাল সম্পর্কে যে কোনো মন্তব্য করা যাইবে, তবে তাহা যেন মানহানিসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন না করে। ইহার পাশাপাশি বিচারপতি ইহাও বলিয়া দিয়াছেন, 'কারো বাকস্বাধীনতা খর্ব করা যায় না।' যেই সকল দেশে গণতন্ত্রের চর্চা রহিয়াছে, কেবল সেই সকল দেশের জন্যই যে এই কথা প্রযোজ্য, তাহা বলাই বাহুল্য। কেননা গণতন্ত্র না থাকিলে মানুষের মানমর্যাদা যেমন থাকে না, তেমনি তাহার বাক্ ও চিন্তার স্বাধীনতাও থাকে না। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কেবল একটি গণতান্ত্রিক দেশেই সম্ভব।

মন্তব্য করিবার স্বাধীনতা, কথা বলিবার স্বাধীনতা সকল সমাজের ডিকশনারিতেই থাকা উচিত। এবং মন্তব্য করিবার সময় যাহাতে অযাচিতভাবে অন্যের সম্মানহানি না ঘটে, তাহার প্রতিও লক্ষ রাখা বাঞ্ছনীয়। এবং এই ক্ষেত্রে আমরা যেন সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ না ঘটাই, তাহাও দৃষ্টিপাতযোগ্য। আমাদের মনে রাখিতে হইবে প্রতিটি মানুষের মানসম্মান ও মর্যাদা পবিত্র বিষয়। আবার একমত না হইলেও অন্যের মতপ্রকাশের সুযোগ করিয়া দেওয়া প্রয়োজন। এই জন্য প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিতে হইবে। প্রত্যেক নাগরিক অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হইলে গণতান্ত্রিক চেতনা বিকশিত হইবে না। আর যেই সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, সেই সমাজ কখনো পিছাইয়া থাকিতে পারে না।

আজিকার দিনে মানুষের হাতে সত্য বিকৃত ও বিড়ম্বিত হইবার কারণেও বিঘ্নিত হইতেছে বাকস্বাধীনতা; কিন্তু উন্নয়ন বা অগ্রগতি অর্জনের যেই রকেটে আমরা সওয়ার হইয়াছি, তাহার কেন্দ্রবিন্দুতে সত্যকে অধিষ্ঠিত করিতে না পারিলে সভ্যতার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী। অন্তত এই সত্যটা আমরা যেন ভুলিয়া না যাই। গণতন্ত্রের চর্চা সমুন্নত রাখিবার প্রশ্নেও ইহা অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। মতপ্রকাশ ও সত্য উচ্চারণের পরিবেশ এবং একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের চর্চা অব্যাহত রাখিবার ব্যাপারে আমাদের সকলকে সচেষ্ট হইতে হইবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি