ঢাকায় গোলাগুলি ও সংঘর্ষে নিহত কাদির হোসেন সোহাগের মা নাছিমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, "আমার কলিজার টুকরো ছেলেটা কই, আমার নিমাই চানরে কে গুলি করে মারল! আমার বুকটা খালি করল কারা? তাদের কি একটুও বুক কাঁপলো না! আমার ছেলেরে কেউ আইন্না দাও, আমি জড়াই ধরব। না জানি আমার সোনার চানের কত কষ্টে দম গেছে, আহারে কোন পাষণ্ড আমার নিরীহ ছেলেরে গুলি করল।"
শনিবার (২০ জুলাই) রাত ৮টার দিকে ঢাকার গোপীবাগ এলাকায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির সময় সোহাগ গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়। নিহত সোহাগ দেবিদ্বার উপজেলার ভানী ইউনিয়নের সূর্যপুর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে। তিনি ঢাকার গোপীবাগ এলাকায় একটি মেসে ভাড়া থাকতেন। পরদিন রোববার সকাল ১১টার দিকে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি সূর্যপুরে আনা হয় এবং দুপুরে জানাজা শেষে বাড়ির পাশে কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সোহাগের মা নাছিমা বেগম বলেন, "২২ বছর ধরে স্বামী নেই। সোহাগের বয়স যখন তিন বছর তখন আমার স্বামী ঢাকা থেকে নিখোঁজ হয়। তারপর আমি ঢাকায় মানুষের বাসায় কাজ করে সোহাগ ও দেড় বছরের সহিদুল ইসলামকে বড় করি। পাঁচ বছর আগে অসুস্থ হয়ে গ্রামের বাড়ি চলে আসি। সোহাগ লেখাপড়া বন্ধ করে সংসারের দায়িত্ব নেয়। ছোট ছেলে সহিদুল মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। অভাবে তার পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায় এবং সে এখন একটি বই বাধাই কোম্পানিতে কাজ করে। আমার চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে সোহাগ একটি কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিতে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করত।"
১০ থেকে ১২ দিন আগে তার চাকরিটা চলে যায়। পরে নতুন একটি কোম্পানিতে চাকরি পাওয়ার কথা ছিল। ১৫ জুলাই বাড়িতে এসে কাগজপত্র নিয়ে নতুন কোম্পানিতে জমা দেয়। এরপর ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু রবিবার আমার ছেলের বুকে গুলি লাগে। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব? আমার ছেলে শেষবার আমাকে ফোন করে বলেছিল, ‘মা ঢাকায় অনেক গোলাগুলি হচ্ছে, অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে।’ এই কথা শুনে আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমি বলি, ‘বাবারে, তুই রুম থেকে বের হইস না।’ সে বলল, ‘মা, আমরা সব রুমমেট একসাথে আছি, বের হয়নি। তবে মেসে কোন খাবার নেই, আমার কাছেও কোন টাকা নেই। তুমি যদি পার, আমার বিকাশে ৫০০ টাকা দিও। আর তুমি ঠিকমত ওষুধগুলো খাইও।’ পরে আমি আমার ছেলের নম্বরে ৫০০ টাকা পাঠাই। সেই টাকা নিয়ে নাস্তা আনতে বের হয় এবং তার পরেই গুলি লাগে।
নিহত সোহাগের ছোট ভাই সহিদুল ইসলাম বলেন, "ভাই গুলি খাওয়ার পর তার বন্ধুরা আমাকে ফোনে জানায়। আমি রাত ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছাই। গিয়ে দেখি ভাইয়ের বুকে ব্যান্ডেজ করা। আমাকে দেখে ভাই বলে, ‘তুই এত রাতে এখানে কেন আসছিস? তুই মাকে দেখে রাখিস।’ এই কথা বলে রাত ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে ভাই মারা যায়।"
নিহত সোহাগের চাচা এখলাছুর রহমান শানিক বলেন, ২২ বছর আগে সোহগের বাবা হারিয়ে যাওয়ার পর তার মা বিভিন্ন বাসায় কাজ করে সন্তানদের বড় করেছেন। তার মা অসুস্থ হয়ে গেলে সোহাগ সংসারের দায়িত্ব নেয়। নতুন একটি কোম্পানিতে চাকরির কথা চলছিল তার। দুই-একদিনের মধ্যে সেখানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। সেটা আর হলো না। ছোটবেলা থেকে বাবার আদর পায়নি ছেলেটা, অভাব-অনটনে বড় হয়েছে। ধরতে গেলে ওরা এতিম ছিল। একটা গুলি এই পরিবারটাকে একেবারে পথে বসিয়ে দিল।
ভানী ইউপি চেয়ারম্যান হাজী জালাল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ছেলেটা কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। সংসারটা সেই চালাত। ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সে মারা যায়। এটি অত্যন্ত হৃদয় বিদারক। আমি পরিষদ থেকে তার মাকে বিধবা ভাতার কার্ড করে দেব।
দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও নিগার সুলতানা বলেন, "এটি একটি মর্মান্তিক মৃত্যু। তার পুরো পরিবার সম্পর্কে আমি খোঁজ-খবর রাখছি। সরকারিভাবে সোহাগের মাকে সাহায্য সহযোগিতা করা হবে।"
