বৃক্ষ প্রেমীদের গল্প

শখ থেকে সাফল্য

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ১৮:২৫

কিছু কিছু শখ কেবল শখের কাতারেই থাকে না। শখের সঙ্গে যখন ভালোবাসা আর পরিশ্রম যুক্ত হয় তখন

তা সাফল্যে রূপ নেয়। শখ থেকে গাছের প্রতি ভালোবাসা যাদের হারতে দেয়নি কখনো, শত বাধা পেরিয়ে গাছকে ভালোবেসে তারা অনেকদূর নিয়ে গেছেন। আর ুতারাই গাছকে আয়ের উত্স করে নিয়েছেন। 

এমন কয়েকজনের গল্প জানাচ্ছেন— আফরিন মিম 

 

সালমা বানু, আবাদী

কখনো বিক্রি করছেন গাছ আবার কখনো গাছ সম্পর্কিত পরামর্শ দিচ্ছেন ক্রেতাদের। বৃক্ষমেলায় আবাদী স্টলে এভাবেই সদাব্যস্ত দেখা যায় আবাদী নার্সারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমা বানুকে। যিনি অল্পবয়সে বিয়ে করে মেডিক্যালে দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়েও সামাজিক বাস্তবতায় পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। কিন্তু থেমে যাননি। সাবলম্বী একজন নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রথম দিকে অন্য নার্সারির সাথে শেয়ারে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে আবাদী নামে নিজস্ব নার্সারি দিয়েছেন সাভারের বিরুলিয়ায়। গাছের প্রতি ভালোবাসা তাকে এককভাবে নার্সারি করার সাহস যুগিয়েছিল। তার এ পথ চলায় তার স্বামী তাকে সমর্থন ও সাহায্য করলেও পরিবারের অন্যকেউ সমর্থন করেনি। কিন্তু তার আজকের এই অবস্থান নিয়ে পরিবারের সবাই গর্ববোধ করে, অন্য নারীদের অনুপ্রেরণা যোগায়। বৃক্ষমেলায় তার স্টলে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গাছ, বীজ, চার ধরনের টব, বিভিন্ন ধরনের সার। বৃক্ষমেলায় প্রতিদিন তার আয় হচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। মেলায় তার স্টলে সর্বনিম্ন ২০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকার গাছ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি স্বপ্ন দেখেন আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে ঢাকার প্রতিটা বাড়ির ছাদ সবুজ করে তোলার।

মুশহেদা খানম রেনু, গ্রীন শপার্স

সারাদিন অফিস করে বয়স যাকে বলে না বাসায় বিশ্রাম নিতে। যিনি অফিস শেষ করেই চলে আসেন স্টলে। বিক্রি করেন গাছ। গাছের প্রতি ভালোবাসা যাকে সেই বুঝার বয়স থেকে এখনো বেঁধে রেখেছে গাছের সাথে। তিনি হচ্ছেন গ্রীন শপার্স নার্সারির মালিক মুশহেদা খানম রেনু। যিনি পেশায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি ডিরেক্টর। কাজের ফাঁকে যিনি শখে নার্সারি করেছেন। এখন এই নার্সারি তার আয়ের অন্যতম উত্স। পরিবারের মানসিক সাপোর্ট তাকে দুইটি কাজের সমন্বয় করে এতদূর নিয়ে এসেছে। তার নার্সারিতে সকল প্রকার দেশি বিদেশি ফুল, ফল ও শোভা বর্ধনকারী গাছ পাওয়া যায়। বৃক্ষমেলায় তার স্টলে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান আনার, ২০ কালারের শাপলা এবং গাউন্ড অর্কিড পাওয়া যাচ্ছে। বৃক্ষমেলায় প্রতিদিন তার আয় হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা। মুশহেদা খানম মনে করেন, প্রতিটা মেয়ে ছাদ বাগান করে ঘরে বসে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। নারীদের প্রতি তার আহ্বান হচ্ছে, ভারতীয় সিরিয়াল দেখে সময় নষ্ট না করে সেই সময়টা গাছ লাগান, গাছের পরিচর্যা করুন।

শাহনাজ চৌধুরী এ্যানী, এ্যানী’স গার্ডেন

সদা হাস্যোজ্জ্বল শাহনাজ চৌধুরী এ্যানী। বৃক্ষমেলায় মেয়েকে পাশে নিয়ে হাসিমুখে ক্রেতাদের সাথে দরকষাকষি করছেন। বিক্রি করছেন গাছ। তার আজকের এই হাসি মাঝপথে থমকে গিয়েছিল। পরিবারের, সমাজের নানা কটূ কথা, বাঁকা চোখে তাকানো সহ্য করতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু তিনি হেরে যেতে চাননি কখনো। ২০১১ সালে  স্বামীকে হারিয়ে ছোট তিন মেয়েকে নিয়ে আর্থিক টানাপোড়নে পড়ে যান এ্যানী। কিন্তু হতাশা তাকে স্পর্শ করেনি। মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একা লড়াই করতে থাকেন সমাজের সাথে। গাছ ভালোবাসেন, তাই গাছ নিয়েই কিছু একটা করার স্বপ্ন দেখতেন। শখে নয় বরং বেঁচে থাকার তাড়নায় নার্সারি করেছেন তিনি। প্রথমদিকে বিভিন্ন নার্সারির সাথে শেয়ারে কাজ করেছেন। এরপর ২০১৫ সালে এ্যানী’স গার্ডেন নামে এককভাবে নার্সারি প্রতিষ্ঠা করেন। তার নার্সারিতে ফুল,ফল, ঔষধি ইত্যাদি প্রায় সবধরনের দেশি বিদেশি গাছ পাওয়া যায়।

এ্যানী’স গার্ডেন বাড়ির বারান্দা বা ছাদে বাগান তৈরি করা, অফিসে গাছ ভাড়া দেওয়া ও গাছের পরিচর্যা করা, কারখানায় বাগান করে দেওয়া,  বাগানে ফোয়ারা স্থাপন করা সেবাগুলো দিয়ে       থাকে। বৃক্ষমেলায় প্রতিদিন তার আয় হচ্ছে ৩০  থেকে ৪০ হাজার টাকা। মেলায় তার স্টলে সর্বনিম্ন ২০ এবং সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকার গাছ পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে রাস্তার দুই ধারে, স্কুল-মাদ্রাসায় গাছ লাগানোর মাধ্যমে দেশটাকে সবুজ করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সমাজের নারীদের প্রতি তার              আহ্বান হচ্ছে, নিজেকে সম্মান কর, নিজেকে ভালোবাস। অনেকে অনেক কথা বলবে। সেসবে  কান না দিয়ে নিজে আয়ের উত্স খুঁজো, নিজের মত করে বাঁচো ।