পেনশন শব্দের সাধারণ অর্থ অবসর ভাতা বা অবসরকালীন সুবিধা। এক ব্যক্তি চাকরিতে নিযুক্ত থাকাকালীন তার বেতনের কিছু অংশ এবং সরকার থেকে দেওয়া কিছু অর্থ যোগ করে আলাদা পেনশন তহবিলে রাখা হয়, যা চাকরি থেকে স্বেচ্ছায়, মৃত্যু, অক্ষমতা বা আইনগত কারণে অবসরে যাওয়ার পর ঐ তহবিল থেকে পর্যায়ক্রমিক এককালীন কিংবা মাসিক আর্থিক ও কল্যাণমূলক সুবিধা ভোগ করে থাকেন। এই সুবিধা স্বামী বা স্ত্রীর জীবনকাল এবং কারো মৃত্যুতে তাদের প্রতিবন্ধী সন্তান জীবনকাল পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। কেউ চাইলে আংশিক বা পুরোপুরি পেনশন সারেন্ডার করে মধ্যবর্তী বা এককালীন আর্থিক সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এটাই বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের অধীনে প্রচলিত পেনশন পদ্ধতি, যা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য।
মিলিটারি সার্ভিসের ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম পেনশন পদ্ধতি চালু আছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, অনিবাসী বাংলাদেশি বা সাধারণ জনগণের জন্য এই রকম বা সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি নেই স্ট্যাটিস্টিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ প্রতিবেদন মতে, বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা ১৬ লাখের মতো। আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত ও রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানে ৫ লাখের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এর বাইরে যারা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন, তারা সবাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন। এই প্রচলিত পদ্ধতির উন্নতিকল্পে সরকার সবার জন্য প্রযোজ্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা করতে 'সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩' পাশ করেছে, যা ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখ থেকে কার্যকর হয়।
১৩ মার্চ ২০২৪ সালে 'প্রত্যয়' স্কিম বাধ্যতামূলক করে নির্দেশনা প্রকাশের পরেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ১ জুলাই থেকে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে প্রযোজ্য হয়েছে। ২০২৪ সালে ৪৭ নম্বর এসআরওর মাধ্যমে সব স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানসমূহের চাকরিতে যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী, তারা যে নামেই অভিহিত হোন না কেন, ১ জুলাই ২০২৪ তারিখ ও তৎপরবর্তী সময়ে নতুন যোগদান করবেন তাহাদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত হতে হবে, যা মূল আইনের আওতাবহির্ভূত বা ঐচ্ছিক ছিল।
এই ৪৮ নম্বর এসআরওতে সর্বজনীন পেনশন স্কিম বিধিমালা ২০২৩-এর বিধি ২-এর উপবিধি ১-এ নতুন দফার সংযোজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বশাসিত বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। বিধি ২ (১) (ঘঘ) মতে 'রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান' অর্থ সরকার অথবা কোনো স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত সংস্থার মালিকানাধীন বা উহিতে ন্যস্ত অথবা শতকরা ৫০ ভাগের অধিক সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো ব্যবসায় উদ্যোগ, কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা শিল্প-বাণিজ্য সম্পর্কিত বা অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান; বিধি ২ (১) (ঘঘঘ) মতে 'স্বশাসিত বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা' অর্থে আপাতত বলবৎ কোনো আইন দ্বারা অথবা উহার অধীন অধিষ্ঠিত বা গঠিত কোনো কর্তৃপক্ষ, করপোরেশন, কমিশন, সংস্থা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউশন, কাউন্সিল, একাডেমি, ট্রাস্ট, বোর্ড বা ফাউন্ডেশন, উহা যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, অন্তর্ভুক্ত হইবে; এই নীতি বৈষম্যমূলক।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন বৈষম্য তুলে ধরে আন্দোলনে নেমেছেন প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক না করে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলক করার প্রতিবাদে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান যেমন-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এই বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একযোগে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। তাদের মতে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলক করা বৈষম্যমূলক। প্রত্যয় স্কিম বাধ্যতামূলক করার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকগণ প্রচলিত পেনশন পদ্ধতির চেয়ে কম সুবিধা পাবেন।
পূর্বে প্রচলিত এককালীন আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রচলিত পেনশনে এককালীন গ্র্যাচুইটিসহ পেনশন-সুবিধা পাওয়া যায়, যা থেকে প্রত্যয় স্কিমের অধীনে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঞ্চিত হবেন। এটা সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বেআইনি। চাকরিতে যোগদানের সময় যে প্রত্যাশিত সুবিধাপ্রাপ্তির কথা ছিল, চাকরি করাকালীন এই আইন সেই সুবিধা কেড়ে নিচ্ছে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম উত্তরাধিকারী ও প্রতিবন্ধী সন্তানদের বঞ্চিত করবে, যা অন্যায়। প্রচলিত পেনশন পদ্ধতির এই সুবিধা দেখে অনেক শিক্ষকই চাকরিতে যোগদান করেছিলেন, এখন এই সুবিধা কেড়ে নেওয়াটা তাদের প্রতি অবিচারের শামিল।
বিদ্যমান পদ্ধতিতে বেতন থেকে কোনো কর্তন ছাড়াই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পেনশন-সুবিধা পান, কিন্তু প্রত্যয় স্কিমে বেতন থেকে ১০ শতাংশ কেটে রাখা হবে। অধ্যাপক পদ থেকে অবসরের পর গ্র্যাচুইটি পেয়ে থাকেন প্রায় ৮১ লাখ টাকা, যা নতুন স্কিমে পাওয়া যাবে না। বিদ্যমান পদ্ধতিতে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে পেনশনের ইনক্রিমেন্ট হয়, যা নতুন পদ্ধতিতে থাকবে না। নতুন পদ্ধতিতে সবার পেনশন অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ৬৫. কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ৬২ এবং কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর ছিল। এছাড়া চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা কিংবা এলপিআর-সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়গুলো নতুন বিধানে স্পষ্ট করা হয়নি।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাদ দিয়ে অন্য সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার এই পেনশন ব্যবস্থাপনা কার্যত সর্বজনীন নয়। সর্বজনীন শব্দের আভিধানিক অর্থ সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য এমন কিছু। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩ সরল চোখে পড়লে এটাই বোঝায় যে আইনটি বাংলাদেশের সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি সব নাগরিকের জন্য সমানভাবেই প্রযোজ্য হবে। কিন্তু শতভাগ সরকারি বা মিলিটারি সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য এই আইন এখনো প্রযোজ্য নয় বলে সর্বজনীনতার প্রশ্নে আইনটি উত্তীর্ণ হয়নি। প্রচলিত পেনশন পদ্ধতি এবং সর্বজনীন পদ্ধতির মধ্যে সুবিধাপ্রাপ্তির বৈষম্য আছে। একই দেশে দুই নীতি থাকায় তা বৈষম্যমূলক দৃশ্যমান। দুই পদ্ধতিতেই আর্থিক সুবিধা সমান হলে সবাই একই পদ্ধতি গ্রহণ করবে না কেন? এই নতুন আইন ও বিধিবিধানের দুর্বল দিকসমূহ হলো (১) প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা কম, যা অযৌক্তিক, (২) সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়, (৩) আমলাদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই এই বৈষম্যমূলক আইন তৈরি করা হয়েছে, (৪) বাংলায় আইন প্রণয়নের বিধান থাকলেও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে আইনের নামকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা 'বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭'-এর লঙ্ঘন। (৫) নিয়ম অনুযায়ী ৭৫ বছর পর্যন্ত পেনশন-সুবিধা পাবে, যা প্রচলিত আইনে স্ত্রীর জীবনকাল কিংবা প্রতিবন্ধী সন্তানও পেনশনের কল্যাণমূলক সুবিধা পেত, (৬) প্রতিবন্ধীদের সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটি বাধা হিসেবে কাজ করার কারণে বেআইনি বা অসাংবিধানিক, (৭) উত্তরাধিকারী ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্র এমন আচরণ করতে পারে না, (৮) তথ্য প্রদানের জন্য তথ্য কর্মকর্তা নেই, (৯) আপিল আদালত নেই, আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আপিল আদালত না থাকায় পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। (১০) এ ধরনের বিধান সমাজকে ভারসাম্যহীন করবে, (১১) ঐচ্ছিক স্কিমগুলোর তুলনায় বাজারে প্রতিযোগিতামূলক বা অধিক সুবিধামূলক স্কিম থাকায় এই স্কিমগুলো আলোর মুখ দেখবে না, (১২) মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসবেন না, বরং মেধা বিদেশে পাচার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি ও নীতিমালা অদক্ষ ও দুর্বল নীতির পরিচায়ক। সামাজিক নিরাপত্তাকাঠামোর উন্নয়নকল্পে জনকল্যাণের জন্য সর্বজনীন পেনশন-নীতির দুর্বলতা দূর করে, বৈষম্যমূলক বিধান ভারসাম্যপূর্ণ করলে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আওতাভুক্ত করলে, আর্থিক সুবিধার বিষয় প্রচলিত পদ্ধতির সমান কিংবা বেশি করলে, আমলারা অর্থহীন দাম্ভিকতা বা ইগো পরিহার করলে, আইনপ্রণেতারা জনস্বার্থ বুঝতে পারলে, সর্বোপরি সরকার সারা দেশে ফুঁসে ওঠা জনদাবি মেনে নিলে বা প্রত্যয় স্কিমের প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করে নিলেই বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ একটি টেকসই পেনশন-কাঠামো পাবে বলে আশা করা যায়।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও পাবলিক পলিসি অ্যানালিস্ট
অনুলিখন: এম এ খালেক
