সিজারিয়ান সেকশন :প্রয়োজন-অপ্রয়োজন

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৫

সেই রোমান সভ্যতার সময় মৃত মায়ের পেটের বাচ্চাকে রক্ষা করার জন্য পেট কেটে বাচ্চা বের করা হতো। সম্ভাবনার রাস্তা পেয়ে যাওয়ার পরে জীবন্ত মায়ের পেট কেটে বাচ্চা বের করার চিন্তা শুরু হলো। কথিত আছে, মাদকদ্রব্য সেবন করিয়ে হাত-পা চেপে ধরে তারপর সিজার করা হতো। কিন্তু কাটা জায়গা জোড়া দেওয়ার মতো সেলাই দেওয়ার বুদ্ধি তখনো হয়নি। তাই মৃত্যুর হার ছিল শতভাগ। রক্তক্ষরণ ও ইনফেকশনই ছিল মৃত্যুর প্রধান কারণ। চিন্তা শুরু হলো কীভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা যায়। কলাগাছের বাকলের ভেতরের অংশ কিছুটা স্পঞ্জি, শুকালে গজের মতো হয় বলে সেটা শুকিয়ে সেগুলো দিয়ে কাটা জায়গা পেঁচিয়ে উবু করে শুইয়ে রাখত। চাপে কিছু রক্তক্ষরণ বন্ধ হতো, কিছু রক্তপাত গাছের শুষ্ক বাকলে শুষে নিত।

প্রথম রেকর্ডেড বেঁচে যাওয়া নারীর সিজার হয়েছিল তার স্বামীর হাতে ১৫৮০ সালে, যখন কিছুতেই ডেলিভারি হচ্ছিল না। ১৮৫৩ সালে প্রথম ক্লোরোফর্ম ব্যবহার শুরু হলো। ১৮৬৭ সালে অপারেশনের জায়গা জীবাণুমুক্ত করার জন্য কার্বলিক স্প্রে ব্যবহার শুরু হলো।

জরায়ু যেহেতু রক্তক্ষরণের জায়গা, তাই রক্তক্ষরণ বন্ধের জন্য ১৮৭৬ সালে একজন অবস্টেট্রিসিয়ান সুপারিশ করলেন সিজারের পরে জরায়ু ফেলে দেওয়ার। ১৮৮১ সাল পর্যন্ত কাটা জায়গা সেলাই করার মতো কোনো উপায়ই ছিল না। অবশেষে ১৮৮২ সালে দুজন জার্মান অবসটেট্রিসিয়ান প্রথম সেলাই দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করলেন। পরবর্তী সময়ে নানান গবেষণার মাধ্যমে সহজ পদ্ধতি ও নিরাপদ উপায় বের করা হলো। ধীরে ধীরে হলো অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন।

আজ একবিংশ শতাব্দীতে কোমরে একটি ইনজেকশন দিয়ে পেশেন্টের সজ্ঞান অবস্থায় তার সঙ্গে গল্প করতে করতে একজন সার্জন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে বাচ্চা বের করে পেট এমনভাবে সেলাই করে জোড়া দেবেন যে কেউ বুঝতেই পারবে না এই পেটে কোনো কাটা চিহ্ন আছে। এ যেন বন্ধুর পথে পদব্রজে গমনের সঙ্গে রকেটের তুলনা। কে না পছন্দ করবে এমন ব্যবস্থা? জীবাণুমুক্ত পরিবেশ, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, রক্তের সহজলভ্যতা নিরাপদ করে দিয়েছে এই পদ্ধতিকে।

কিন্তু না, যতই নিরাপদ ও সহজ হোক এই পদ্ধতি, আমরা এটিকে সর্বজনীন করব না। কারণ সন্তান জন্মদান একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। আদিকাল থেকেই এটি চলে আসছে। এটি জৈবিক অন্যান্য প্রক্রিয়ার মতোই। আমরা যেমন সুস্থ অবস্থায় মুখ বাদ দিয়ে নাকে নল দিয়ে খাব না, তেমনি বিনা কারণে স্বাভাবিক পথ বাদ দিয়েও সোজাসাপটা ভিন্ন রাস্তায় সন্তান প্রসব করাব না।

বাংলাদেশে একসময় ফ্যাসিলিটির অভাবে সিজারের হার কম থাকায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার  ছিল অনেক বেশি। প্রতি ২০ মিনিটে একজন মা মারা যেত এবং বছরে মারা যেত ২৮ হাজার  প্রসূতি। একটি ফিজিওলজিক্যাল কারণে একটি মেয়ে মারা যাবে এটি ভাবা যায়? তেমনি ছিল ভিভিএফ-এর মতো দুর্বিষহ মরবিডিটি, যা একটি মেয়ের জীবনকে পঙ্গু করে দেয়। মায়ের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে দেয় যদি বাচ্চা হয় প্রসবজনিত প্রতিবন্ধী। এই অতিরিক্ত মাতৃমৃত্যু রোধের জন্য গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ইমারজেন্সি অবসটেট্রিক কেয়ারের (জরুরি প্রসূতিসেবা) প্রবর্তন করেন অধ্যাপক আব্দুল বায়েছ ভুঁইয়া। এর ফলে গ্রামের প্রসূতিরা কাছাকাছি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।

এই জরুরি প্রসূতিসেবার মধ্যে সিজার অন্যতম। হোম ডেলিভারির চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাচ্চার হাত-পা ঝুলিয়ে, মায়ের জরায়ু ফাটিয়ে, ফুল সরে গিয়ে রক্তক্ষরণ নিয়ে, খিঁচুনি হতে হতে মুখে ফেনা বের করে, দাইয়ের যথেচ্ছা হাতাহাতির পরে মুমূর্ষু অবস্থায় যখন প্রসূতিরা ফ্যাসিলিটিতে আসেন, তখন সিজারই জীবন রক্ষার একমাত্র সহায়ক। মাতৃমৃত্যুর উল্লেখযোগ্য কারণ অবস্ট্রাক্টেড লেবার বা বাধাগ্রস্ত লেবার সেবা পেতে শুরু করল এই সিজারিয়ানের মাধ্যমে। ফলে কমতে শুরু করল শুধু মাতৃমৃত্যু নয়, শিশুমৃত্যু এবং ভিভিএফ।

একজন চিকিত্সকের ধ্যানধারণা সব সময়ই পেশেন্টকেন্দ্রিক। তার পেশেন্টের জন্য তার চেয়ে বেশি দরদ আর কারো নেই। ওজিএসবি সব সময়ই এদেশের মায়েদের স্বাস্থ্যের উন্নতিকল্পে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো ও পলিসি প্রণয়ন একটি বড় সীমাবদ্ধতা। আমরা আমাদের বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের পেশেন্টদের বৃহত্তর স্বার্থ দেখাই আমাদের ব্রত হওয়া উচিত। তাই পেশেন্টের স্বার্থে, ঠিক ঐ মুহূর্তের অবস্থা অনুযায়ী তার জন্য ভালো যা কিছু দরকার, আমরা সেটাই করে থাকি এবং করব। তবে ক্লিনিক মালিকের সাজানো পেশেন্টদের অপারেশন করে যারা অভ্যস্ত, তাদের প্রতি অনুরোধ, আপনার শ্রমের বিনিময়ে তার পকেট ভারী করার সুযোগ দেবেন না। আপনি ক্লিনিশিয়ান, সিদ্ধান্ত হবে আপনার; ক্লিনিকের মালিকের নয়। সব শেষে স্লোগান আমাদের একটাই—‘একটি সুস্থ মায়ের থেকে একটি সুস্থ বাচ্চাই আমাদের কাম্য।’

n লেখক :স্ত্রীরোগ, প্রসূতিবিদ্যা ও ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ