সংস্কারের মাহেন্দ্রক্ষণে অভিনন্দন ড. মুহাম্মদ ইউনূস

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৪, ১৩:৫০

একটি অস্বাভাবিক প্রতিকূল সময়ে, জাতির এক বিশেষ ক্রান্তিকালে নূতন করিয়া দেশ বিনির্মাণের কান্ডারি হিসাবে দায়িত্ব লইয়াছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে তিনি এবং তাহার উপদেষ্টা হিসাবে যাহারা দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়াছেন-সবাইকে জানাই অভিনন্দন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে পুরস্কারটি আসিয়াছে শান্তিতে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে নিশ্চয়ই এক নবধারায় স্নাত হইবে এই দেশ। বারংবার তিনি তাহার দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রাখিয়াছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি নাগরিক কমিটি গঠন করিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। সেইখানে অন্য বাঙালিদের সঙ্গে বাংলাদেশ তথ্যকেন্দ্র পরিচালনা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে উদ্যোগী হন। আমরা স্মরণ করিতে চাই, ২০০৬ সালে তিনি এবং তাহারই প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যখন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়, তাহার পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনারে অনেক বার বলিয়াছেন, তিনি দারিদ্র্য জাদুঘর বানাইতে চাহেন। জাদুঘরে সেই জিনিসই থাকে, যাহা পৃথিবী হইতে বিলুপ্ত হয়। বলা যায়, আমাদের সবচাইতে বড় অভিশাপ হইল 'দারিদ্র্য', যাহার নির্মম বর্ণনা আমরা পাই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'দারিদ্র্য' কবিতায়। নজরুল দরিদ্রতার কশাঘাতের বর্ণনা দিতে গিয়া বলিয়াছেন, 'টলটল ধরণীর মত করুণায়।/ তুমি রবি, তব তাপে শুকাইয়া যায়/ করুণা-নীহার-বিন্দু! ম্লান হয়ে উঠি/ ধরণীর ছায়াঞ্চলে! স্বপ্ন যায় টুটি।' সুতরাং দরিদ্রতা দূর করা হইল শান্তি আনয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। তিনি পৃথিবী হইতে দারিদ্র্য বিলোপের মহামন্ত্র বিলাইয়াছে সমগ্র বিশ্বময়।

ড. ইউনূসের জন্মদিন ২৮ জুন তারিখটি গত এক দশকের বেশি সময় ধরিয়া বৈশ্বিকভাবে 'সামাজিক ব্যবসায় দিবস' হিসাবে পালন করা হইয়া থাকে। পৃথিবীর ৮০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে তাহার নামে 'ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার' প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, সেইখানে ড. ইউনূসের চিন্তা, কাজ, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও তাহার জীবনাদর্শ লইয়া গবেষণা হয়। এখন পর্যন্ত ২৪টি দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় হইতে তিনি ৬০টির মতো সম্মানসূচক ডিগ্রি পাইয়াছেন। সারা বিশ্ব হইতে শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করিয়াছেন। কানাডা ও জাপানের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে তাহার জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। সেই জীবনী নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে হালনাগাদ হইবে কীভাবে তিনি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব লইয়া দেশটিকে কোন উচ্চতায় লইয়া গিয়াছেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, এমন একজন বিশ্বখ্যাত আমাদের দেশটিকে নূতন মাত্রায় সংস্কারের অধিনায়ক হইয়াছেন। ইহা তাহার জন্য এবং সারা দেশের জন্য এক অভাবিত মাহেন্দ্রক্ষণ।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট পদত্যাগের পর কার্যত গত তিন দিনে দেশে কোনো সরকার ছিল না। কোনো থানায় পুলিশ ছিল না। এই সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাইয়াছে বিভিন্ন স্থানে। ডাকাতি, অরাজকতা অস্থিরতার আতঙ্কে ভূগিয়াছে সারা দেশের মানুষ। মানুষের মধ্যে যে ভয়াবহ ট্রমা তৈরি হইয়াছে, আইনশৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনা এবং স্বস্তির পরিবেশ ফিরাইয়া আনা এখন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একই সঙ্গে বিশেষভাবে আশ্বস্ত করিতে হইবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে। সংখ্যালঘুদের পক্ষ হইতে বলা হইতেছে, গত তিন দিনে ৫২টি জেলায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়াছে। তবে ড. ইউনূস বলিয়াছেন যে, অরাজকতার বিষবাষ্প যাহারা ছড়াইবে, তাহাদের কঠোর হাতে দমন করা হইবে।
প্রায় ১৮ কোটির এই অতি জনঘনত্বের দেশটির সংস্কারসাধন খুব সহজ কাজ নহে। অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ড. ইউনুসের এই যাত্রা। কিন্তু ৮৪ বছরে প্রাজ্ঞ গভীর ধীশক্তিসম্পন্ন, বিচক্ষণ ড. ইউনূস নিশ্চয়ই তাহার জীবনের সবচাইতে বড় দায়িত্বটি সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাইবেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলিয়াছেন, 'সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে।' তিনি নিশ্চয়ই নূতন বাংলাদেশ গড়িয়া নিজেকে এই নরকূলে ধন্য করিবেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন