সামান্য স্ফুলিঙ্গ হইতেই অনেক সময় দাবানলের সৃষ্টি হয়। অনুরূপভাবে ছোট্ট সংঘাত হইতে বড় ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষ বা যুদ্ধবিগ্রহের সৃষ্টি হইতে পারে। একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়া আমরা আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ কয়েকটি ভয়াবহ যুদ্ধ লক্ষ করিয়াছি। এখনো ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ সমগ্র পৃথিবীকে অস্থির ও তটস্থ করিয়া রাখিয়াছে। ফিলিস্তিনের গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া ইরান, লেবানন ও ইয়েমেন অশান্ত। একদিকে ইরানের মাটিতে হামাসের শীর্ষনেতা ইসমাইল হানিয়ার হত্যাকাণ্ড, ইসরাইলের হামলায় হামাস ও লেবাননকেন্দ্রিক হেজবুল্লাহর কয়েক জন কমান্ডারের মৃত্যু সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করিয়া তুলিয়াছে, অন্যদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া ইউক্রেন সেনাবাহিনী ১ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও অধিক আয়তনের এলাকা দখল করিয়া লইয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হইতেছে, যে কোনো সময় যে কোনো মুহূর্তে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া বিশ্বে বড় ধরনের অঘটন ঘটিয়া যাইতে পারে।
ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ইসরাইলকে সহসা ছাড়িয়া দিবে বলিয়া মনে হয় না। আশঙ্কা করা হইতেছে, এইবার কোনো প্রকার ঘোষণা না দিয়াই ইরান ইসরাইলে হামলা চালাইতে পারে। ঐদিকে ইসরাইলকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ প্রস্তুত। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ এখন অবস্থান করিতেছে লোহিতসাগরে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পূর্বে বাইডেন প্রশাসনের জন্য সুবিধাজনক হইল সিজফায়ার বা যুদ্ধবিরতি: কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে হামাস নূতন করিয়া আলোচনার টেবিলে না আসায় সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। ইহা ছাড়া রাশিয়ার পার্লামেন্টের এমপি মিখাইল শেরেমেতের মতে, বেসামরিক অবকাঠামোর উপর পশ্চিমা সামরিক সাজসরঞ্জাম, পশ্চিমা গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলায় বিদেশিদের অংশগ্রহণের অকাট্য প্রমাণ দেখিয়া যে কেহ এই সিদ্ধান্তেই পৌছাতে পারে যে, বিশ্ব তৃতীয় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌছিয়া গিয়াছে। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কথার প্রতিধ্বনি করিয়া বলিয়াছেন, ন্যাটো দেশগুলো ইউক্রেনের এই আগ্রাসন পরিকল্পনায় সবুজ সংকেত দিয়াছে।
আমরা জানি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চাইতে বহুলাংশে ধ্বংসাত্মক ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ইতিমধ্যে সাত দশকেরও অধিক সময় অতিবাহিত হইয়াছে; কিন্তু এখনও সেই মরণযজ্ঞের ছাপ রহিয়া গিয়াছে পৃথিবীর আনাচকানাচে। এখনও সেই মহাযুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রহিয়াছে সমগ্র বিশ্ব জুড়িয়া। প্রায় ৬০ মিলিয়নের উপর মানুষ মারা যায় এই মহাযুদ্ধে, যাহা তখনকার বিশ্ব জনসংখ্যার ছিল ৩ শতাংশ। এখন যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তাহা হইলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, পূর্বের তুলনায় উন্নতমানের মারণাস্ত্র, ড্রোন হামলা প্রভৃতি কারণে ক্ষয়ক্ষতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেও যে ছাড়াইয়া যাইবে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। উল্লেখ্য, পূর্ব এশিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে জাপান ১৯৩৭ সালে প্রজাতন্ত্রী চীনে আক্রমণ করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। ইহার জের ধরিয়া ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এইভাবেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এখন বিশ্বের উদ্বেগজনক ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করিয়া আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দামামা কি আমরা শুনিতে পাই না? লিগ অব নেশনসের ন্যায় জাতিসংঘও এখন একটি ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয় নাই কি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি ও জার্মানি এই সুযোগই গ্রহণ করিয়াছিল। আজও কি রাশিয়া ও ইসরাইল জাতিসংঘ ও বিশ্বমতামত কিংবা আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে গ্রাহ্য করিতেছে? আন্তর্জাতিক নিরস্ত্রীকরণ সমস্যার কি কোনো সমাধান হইয়াছে? পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি কি বন্ধ হইয়াছে? বরং এই পৃথিবী যে কোনো সময়ের চাইতে আজ বহুধা বিভক্ত, বহু মেরুকরণে আরো বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। তাই আজ শান্তির লোলিত বাণী শুনাইতেছে ব্যর্থ পরিহাস!
এমন এক পরিপ্রেক্ষিতে আজ চারিদিকে বিরাজ করিতেছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। গণহত্যা চলিতেছে দেশে দেশে। ঘটিতেছে লক্ষ লক্ষ বনি আদমের বাস্তুচ্যুতির ঘটনা। ইহারই মধ্যে শোনা যাইতেছে ফ্যাসিবাদী শাসকদের অট্টহাসি। ইসরাইল-হামাস, রাশিয়া ও ন্যাটো, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে বর্তমানে যে উত্তেজনা চলিতেছে, তাহার সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া হিসাবেই প্রাদুর্ভাব ঘটিতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের। তাই বিশ্বনেতৃবৃন্দকে সতর্ক হইতে হইবে
সর্বান্তঃকরণে।
