মহান সৃষ্টিকর্তা কী অপূর্ব সৃষ্টি-সুষমায় এই ধরণিকে অলংকারিত করিয়াছেন! এইখানে প্রকৃতি এবং প্রাণিজগতের অপূর্ব লীলাখেলা দেখিয়া আমরা আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে শুধু এইটুকু বুঝিতে পারি-সৃষ্টিকর্তার কী অপার মহিমা! অপরদিকে, এই বিশ্বজগতের আকাশমণ্ডল, পৃথিবীর ভূমি ও জলভাগের প্রাণিজগতের বিশাল বৈচিত্র্য বলিয়া দেয়-আমরা কত ক্ষুদ্র! এই ক্ষুদ্র আমরাই এই পৃথিবীর এক বিশাল পরিবর্তন সাধন করিয়াছি। অন্যদিকে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি মানুষই নিজের কর্মের ছাপ রাখিয়া যাইতে চাহে। বিবেকানন্দ যেমন মনে করিতেন-পৃথিবীতে যেইহেতু আমরা জন্মলাভ করিতে পারিয়াছি, সেইহেতু এইখানে একটি 'দাগ' রাখিয়া যাওয়া উচিত। এখন এই 'দাগ' রাখিয়া যাওয়াটা সম্ভব হইবে আমাদের ইতিবাচক কর্ম তথা সুকীর্তির মাধ্যমে। মনীষীরা বলেন, সুখ অপেক্ষা বরং দুঃখ অধিকতর শিক্ষা দেয়। আর একটি পরম শিক্ষা হইল-'জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে'।
আমরা জগতের চারিদিকে দেখিতেছি কত ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, বিভিন্ন অস্ত্রের চোখ রাঙানি; কিন্তু আমরা কেহ কি চিরকাল বাঁচিয়া থাকিতে পারিব? মুশকিল হইল-যাহারা বিপুল ক্ষমতাশালী হইয়া যান-তাহাদের মনোজগৎ যেন অন্যরকম হইয়া যায়। ক্ষমতার অতি উষ্ণ প্রতাপে অনেকেই মনে করেন, তাহারা যেন অমর! কিন্তু তাহারা যদি প্রতিক্ষণ স্মরণে রাখিতেন- রাতে ঘুমাইতে যাইতেছি, সেই ঘুমই শেষ ঘুম হইতে পারে; যেই খাবারটা খাইতেছি-উহাই শেষ খাবার হইতে পারে। মহান আল্লাহতায়ালা (সুরা নিসা, আয়াত ৭৮) ঘোষণা করিয়াছেন- তোমরা যেইখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাইবেই, যদিও তোমরা কোনো শক্ত ও সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করো।' আল্লাহতায়ালা আরো বলিয়াছেন, 'আমি তোমাদের মৃত্যুর সময় ঠিক করিয়া দিয়াছি।' (সুরা ওয়াকিআহ: ৬০)। মুশকিল হইল, ক্ষমতাবানরা ভুলিয়া যান ধর্মের কথা, জগতের পরম সত্য কথা। তাহারা যদি এই সত্য সর্বদা মনে রাখিতেন, তাহা হইলে পৃথিবীর ইতিহাসও আজ অন্যরকম হইতে পারিত। হাজার হাজার বৎসর ধরিয়া অসভ্য অবস্থা হইতে মানুষ যতই সভ্য হইয়া উঠুক না কেন, 'মানুষ মানুষের জন্য'- এই সত্যটি সবচাইতে অধিক উপেক্ষিত থাকিয়াছে। সামগ্রিকভাবে নহে, মানুষ ব্যক্তিগতভাবে অমর হইতে চাহে। ইহাই তাহাকে স্বার্থপর করিয়া দেয়। পৃথিবী জুড়িয়া চারিদিকে এত যে ভাস্কর্য, এত যে নামফলক-তাহারা নেপথ্যে ঐ অমরত্বেরই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা কাজ করিয়া থাকে।
অমরত্ব লাভের মানসে প্রাচীনকালে রাজা- মহারাজারা বিভিন্ন কেমিস্ট নিয়োগ করিতেন অমৃতসুধা আবিষ্কারের জন্য। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ বৎসর পূর্বেকার চীনের মহাপরাক্রমশীল সম্রাট কিন শি হুয়াং মৃত্যুর কথা চিন্তাই করিতে পারিতেন না। তিনি চাহিতেন তাহার রাজ্যের বিজ্ঞানীরা শুধু অমরত্বের রহস্য অনুসন্ধানেই ব্যস্ত থাকুক, অন্য সকল কিছুই তাহার নিকট ছিল সময়ের অপচয়। শুনা যায়, অমরত্বের সুধা বানাইবার ব্যর্থতার দায়ে তিনি প্রায় ৪৫০ বিজ্ঞানীকে জীবন্ত কবরও দিয়াছিলেন। তাহার পরও অমরত্ব সুধা হুয়াংকে অমরত্ব দান করিতেই পারে নাই। তাহার মৃত্যুর পর মৃতদেহটিকে পচা মাছ দিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইয়াছিল যাহাতে মৃতদেহের পচা গন্ধ চাপা পড়িয়া যায়। জীবিতাবস্থায় কিন শি বড় গলায় বলিতেন-তাহার বংশধরেরা সহস্র অযুত বৎসর রাজ্য শাসন করিবে। অথচ বিধাতার নির্মম পরিহাস হইল-তাহার মৃত্যুর মাত্র তিন বৎসরের মধ্যেই তাহার বংশের আস্ফালন চিরতরে শেষ হইয়া যায়।
প্রকৃত অর্থে মহাকালের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে সকলকে ক্রমশ বিলীন হইয়া যাইতেই হয়। এই জন্য পৌরাণিক যুগে ঋষির নিকট বসিয়া শিষ্য যখন জিগ্যেস করেন, 'কী করিয়া অমর রহিব, গুরুদেব?' ঋষি উত্তরে বলেন, 'মানুষের জন্য ভালো কাজ করো বৎস, মানুষের মনে অমর রহিবে।' অর্থাৎ মানুষ মূলত বাঁচিয়া থাকে তাহার সুকীর্তির মাধ্যমে। এই কারণে সুকীর্তি এত গুরুত্বপূর্ণ। সুকীর্তিই মানুষকে অমর করিয়া তোলে। এই জন্য আমাদের এমনতর মানসিক বিকাশ ঘটাইতে হইবে যাহাতে সুকীর্তিই আমাদের লক্ষ্য হয়।
