গত শতাব্দীর ষাটের দশক হইতে আরম্ভ করিয়া নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দেশের যুব সম্প্রদায় লইয়া একটি বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করে হংকং, সিংগাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের ন্যায় কতিপয় দেশ। যুব কর্মশক্তিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রথমে 'দক্ষ' হিসাবে গড়িয়া তুলিবার পর উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে জনমিতির সুবিধা, তথা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সদ্ব্যবহারের পথে হাঁটে এই দেশগুলি। এই মহতী উদ্যোগ জাতিগুলির জন্য কতটা সুফল বহিয়া আনে, তাহা প্রত্যক্ষ করিয়াছে সমগ্র বিশ্ব। তবে দুঃখজনকভাবে অনেক দেশ এই ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করিতে পারে নাই বা পারিতেছে না। এই তালিকায় আমরাও রহিয়াছি এবং বলিতে হয়, আমাদের অবস্থান তালিকার একেবারে উপরের সারিতে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, বিগত পাঁচ বৎসরে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দ্বিগুণ হইয়াছে, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়িতেছে। ২০১৭ সালে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা যেইখানে ৪ লক্ষ ছিল, সেইখানে ২০২২ সাল শেষে তাহা বৃদ্ধি পাইয়া দাঁড়ায় ৮ লক্ষ। বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা নিশ্চয়ই আরো বাড়িয়াছে। অথচ ফিলিপাইনের জাতীয় বীর পণ্ডিত জোসে রিজাল বলিয়াছেন, 'তারুণ্যই হইল আমাদের ভবিষ্যতের একমাত্র আশা।' তাহার এই উক্তির যথার্থতা প্রমাণে আমরা কার্যত কি ব্যর্থতার পরিচয় দিতেছি না?
কোনো একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের অধিক যখন শ্রমশক্তিতে পরিণত হয়, অর্থাৎ পরনির্ভরশীল জনসংখ্যার চাইতে কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার অধিক হয়, তখন সেই অনুপাতকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলে (ইউএনএফপি) উল্লেখ আছে, ১৫ হইতে ৫৯ বছর বয়সি ব্যক্তি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসাবে বিবেচিত। এই বয়সি মানুষ তাহাদের শ্রম ও মেধা দিয়া জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভৃত ভূমিকা রাখিতে পারেন। সেই হিসাবে বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধাভোগী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শতকরা ৬৮ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষম। জনমিতির হিসাবে, ২০১২ সাল হইতে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবর্ণ সময় পার করিতেছে, যাহা ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকিবে। ইহার পর হইতে দেশে মৃত্যুহার আরো কমিয়া গিয়া দেশে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়িতে থাকিবে। এমতাবস্থায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ লইতে হইলে ঐ সময়ের পূর্বেই দেশের বর্তমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষিত করিয়া দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করিতে হইবে। তাহাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করিতে হইবে। পরিতাপের বিষয় হইল, এই ক্ষেত্রে প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক রহিয়াছে আমাদের!
উপর্যুক্ত পরিস্থিতি হইতে উত্তরণে 'দক্ষ মানবসম্পদ' তৈরির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণ সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ। যেহেতু সরকারি খাতে কর্মসংস্থান কম, তাই বেসরকারি খাতকে নূতন করিয়া চাঙ্গা করিতে হইবে। লক্ষ করিলে দেখা যাইবে, বিগত এক দশক ধরিয়া বেসরকারি খাতের অবস্থা নাজুক। বেসরকারি বিনিয়োগ এই দীর্ঘ সময়ে জিডিপির ২২-২৩ শতাংশে আটকা রহিয়াছে। একইভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি। আবার শ্রমবাজারে নারীদের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবতা হইল, একটি দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইলে সকলের পূর্বে প্রয়োজন গুড গভর্ন্যান্স বা সুশাসন। প্রতিষ্ঠানগুলির জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতারও কোনো বিকল্প নাই। মনে রাখিতে হইবে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করিবার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করিতে না পারিলে আমাদের এই বিপুল জনগোষ্ঠী অচিরেই 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' তৈরির বদলে 'ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার' তৈরি করিতে পারে। মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলিয়াছেন, 'আজিকার তরুণেরাই আগামীকালের নেতৃত্বগোষ্ঠী।' একইভাবে চাণক্য বলিয়াছেন, 'পৃথিবীর সবচাইতে বৃহৎ ক্ষমতা হইল তারুণ্য।' সুতরাং, এই তারুণ্যশক্তিকে মোটেও অবহেলা করা যাইবে না। দেশের বেকার যুব ও তরুণ সমাজের সার্বিক সমস্যার সমাধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করিবে বলিয়া আমরা আশা করি।
