যেই দেশের মানুষ নিয়মিত সুপেয় পানি পান করিতে পারে না, সেই দেশ কখনই উন্নতির কাতারে আসীন হইতে পারিবে না। সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত 'সায়েন্স' ম্যাগাজিন জানাইয়াছে, বিশ্বের ৮০০ কোটির জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় 8৪০ কোটি মানুষের নিকট নিরাপদ পানযোগ্য পানির সংস্থান নাই। ইহাদের অর্ধেক নিয়মিত যেই পানি পান করেন, তাহাতে ই-কোলাইয়ের মতো ব্যাকটেরিয়া রহিয়াছে। সায়েন্সের গবেষণাপত্রে আরো বলা হইয়াছে, ৪৪০ কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরই বসবাস দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় ।
নিরাপদ পানি মানুষের অধিকার। পৃথিবীর সাধারণ মানুষ তাহাদের প্রাপ্য অধিকার পাইতেছেন কি না, ২০১৫ সাল হইতে তাহার সমীক্ষা শুরু করে জাতিসংঘ৷ ইহার ১৭১০ হইত: কিন্তু তাহাতে কেবল দেখা হইত যে, বিশ্বে পানীয় জলের উৎস বা ভাস্ডারগুলিতে উন্নতি হইয়াছে কি না। তাহাতে দেখা গিয়াছিল, বিশ্বের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের নিকটই পানি রহিয়াছে বটে: কিন্তু সেই পানীয় জল নিরাপদ কি না- তাহা লইয়া পরিষ্কার তথ্য ছিল না। ২০১৫ সালে ঘোষিত জাতিসংঘের টিকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম লক্ষ্য ছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষের নিকট সুলভে নিরাপদ ও পরিস্রুত পানি পৌছাইয়া দেওয়া। আন্তর্জাতিক সংগঠনটি পরে তাহাদের লক্ষ্যমাত্রায় আরো কিছু বিষয় সংযোজন করিয়াছে৷ যেমন--উন্নত পানীয় জলের উৎস থাকিবে, প্রতিটি মানুষের নিরাপদ পানির উৎস তাহার বাসস্থানের নিকটবতী হইবে, এবং নিয়মিত পানির জোগান থাকিবে৷ এই লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রাখিয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও জাতিসংঘের শিশু-অধিকার সংস্থা ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে তৈরি 'জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম ফর ওয়াটার সাপ্লাই, স্যানিটেশন আ্যান্ড হাইজিন' (জেএমপি) গবেষণা শুরু করে। ২০২০ সালে তাহারা জানাইয়াছে যে, আনুমানিক ২২০ কোটি মানুষের নিকট নিরাপদ পানির জোগান নাই।
বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ মানুষের আওতার মধ্যে পানির কোনো না কোনো উৎস রহিয়াছে: কিন্তু ইহা সকলই পানযোগ্য নহে। বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির যেই সকল উৎস রহিয়াছে সেইগুলিও ক্রমশ দূষিত হইয়া পড়িতেছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা ৮০ শতাংশ পানিতে ক্ষতিকর জীবাণু ই-কোলাই রহিয়াছে। পুকুরের পানিতেও একই মাত্রায় এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে ৷ যথাযথ স্যানিটেশন বির না থাকায় পানি দূষিত হইয়া পড়িবার অন্যতম একটি কারণ বলিয়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে। বিশ্লেষকরা বলিতেছেন, বাংলাদেশ ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলে সুপেয় পানিসংকটের অন্যতম কারণ হইল ভূগর্ভস্থ স্তর দ্রুত নিচে নামিয়া যাইতেছে ৷ ইহার অন্যতম কারণ পানির চাহিদা বাড়িতেছে। আর যেই হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিতেছে, সেই হারে পানির স্তর পূরণ হইতেছে না৷ বর্ষার মৌসুমে বাংলাদেশের অধিকাংশ জায়গায় পানির ভূগর্ভস্থ স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে চলিয়া আসিলেও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল ও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে না বলিয়া জানাইতেছেন বিশেষজ্ঞরা৷ ইহার কারণ হইল- অত্রাঞ্চলে বিপুল জনসংখ্যার বসবাস এবং পানির চাহিদাও সর্বাধিক সেই কারণে এই সকল অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট বাড়িয়াই চলিতেছে ।
বহু পূর্বেই অনেক মনীষী পূর্বাভাস দিয়া গিয়াছেন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হইবে পানির জন্য। এই পানির একটি অংশ চাষাবাদের জন্য, আরেকটি অংশ নিরাপদ পানির জন্য--যাহার ব্যত্যয় ঘটিলে সুস্থভাবে জীবনধারণ করা সম্ভব নহে। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, নিরাপদ পানির সংকটের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের কথাও মাথায় রাখিতে হইবে৷ অনিরাপদ পানি পান করিবার অর্থ হইল জানিয়া-শুনিয়া পেটের পীড়া ডাকিয়া আনা । আমাদের সকল ধরনের উন্নয়ন ব্যর্থ হইবে, যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নিকট আমরা নিরাপদ পানি নিশ্চিত করিতে না পারি।
