'জল বাড়ছে, জল বাড়ছে, শুকনো নদীগুলো/এখন উন্মাদিনী/ নেমে আসছে পাহাড়ী ঢল, ভেসে যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত/ ভেঙে পড়ছে চা-বাগান/ ডুবছে গ্রাম'-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'জল বাড়ছে' নামক কবিতার বাস্তবতা আমরা ফি বৎসরই অনুধাবন করিয়া থাকি। বলিতে হয়, অনুধাবনে বাধ্য হই- ইহা যেন ভাটির বাংলাদেশের নিয়তি! অখণ্ডণীয় সেই ললাটলিখনের ধারাবাহিকতায় বর্ষার শেষ প্রহরে আসিয়াও বানের ঘোলা জল গ্রাস করিল এই জনপদকে। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে নিপতিত আমরা! অতিবৃষ্টি ও উজান হইতে নামিয়া আসা পানিতে দেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হইয়াছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী এই লেখা পর্যন্ত দেশের ১১টি জেলা বন্যাকবলিত। জেলাগুলিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ লক্ষ, পানিবন্দি হইয়া পড়িয়াছে প্রায় ১০ লক্ষ পরিবার। কবলিত এলাকায় জনজীবন হইয়া পড়িয়াছে চরম বিপর্যস্ত, বিপন্ন। চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত প্রাণ হারাইয়াছে ১৫ জন। হতাহতের শিকার পরিবারগুলির প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। একই সঙ্গে এই মুহূর্তে বন্যাদুর্গতদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল নিশ্চিত করা প্রধান কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। চলমান দুর্যোগকালে যাহার যাহা কিছু আছে, তাহা লইয়া কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াইতে হইবে।
চলতি বৎসর দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বন্যা সংগঠিত হইতে দেখা গিয়াছে। তবে চলমান বন্যা অনেকটা 'কল্পনাতীত'। যদিও এই বন্যার বিষয়ে পূর্ব হইতেই সতর্ক বার্তা ছিল বলিয়া গণমাধ্যমগুলির খবরে জানা যায়। কেহ কেহ বলিয়াছিলেনও। বাংলাদেশে ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উপরে যেইরূপ রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি ও বন্যার সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া চারটি প্রধান কারণ খুঁজিয়া পাইয়াছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা-এল-নিনো, মেডেন-জুলিয়ান দোলন বা সংক্ষেপে এমজেও, জেট স্ট্রিম এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি লঘুচাপ। বিশেষজ্ঞদের দাবি, 'আবহাওয়া-সম্পর্কিত এই চারটির প্রতিটি কারণই পৃথক পৃথকভাবে যথেষ্ট বৃষ্টিপাত ঘটাইবার জন্য দায়ী। দৈবক্রমে চলতি মাসের ১৫ তারিখের পর হইতে একই সঙ্গে উক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর উপর একই সময় সক্রিয় হয় এবং যাহার প্রভাবে অঞ্চলগুলিতে রেকর্ড পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঘটে।' উল্লেখ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস-বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও ব্যাবহারিক অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে বর্তমানে তিন দিন হইতে ১৫ দিন পূর্বের আবহাওয়া পূর্বাভাস করা যায় বেশ নিখুঁতভাবে। উপরন্তু, তিন দিন পূর্ব হইতে শতকরা ৯০ ভাগ নিশ্চয়তা সহকারে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া যায়; অর্থাৎ, বাংলাদেশ ও ত্রিপুরা রাজ্যে যেই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি প্রত্যক্ষ করা গেল, তাহার পূর্বাভাস জানিতে পারিলে এবং তাহা সঠিকভাবে আমলে লইতে পারিলে ক্ষয়ক্ষতি কম হইত।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপখ্যাত বাংলাদেশ বরাবরই জলবায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত। নদনদী ও 'বন্যাভূমির ভূপ্রকৃতি'তে অবস্থিত এই ভূখণ্ড বর্ষার বন্যার সঙ্গে জন্মলগ্ন হইতেই সুপরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘনঘন তীব্র বন্যা সংঘটিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গভীর সংকটময় মুহূর্তের সম্মুখীন দুর্যোগপ্রবণ এই জনপদ। এমন একটি অবস্থায় ভূপ্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই চালাইয়া যাওয়ার পাশাপাশি বন্যা প্রতিরোধে রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের বিষয়ে চিন্তাভাবনা অতি জরুরি বটে। বস্তুত, উজানের ঢলের সঙ্গে আসা প্রচুর পরিমাণ পলি জমিয়া দেশের জলাশয়গুলি পানি ধারণক্ষমতা হারাইয়া ফেলে। এই অবস্থায় নদনদী ও খালগুলি নিয়মিত ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি নূতন নূতন জলাধারের বন্দোবস্ত করিবার ন্যায় বন্যা প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
ক্ষমতার পটপরিবর্তনে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নবগঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশে অর্থবহ পরিবর্তন আনিবার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দক্ষতার সহিত চলমান দুর্যোগ সামাল দিতে পারিবেন বলিয়া আমরা আশা করি। এই লক্ষ্যে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর স্বার্থে প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠনসহ 'অপারেশন কমিটি' গঠন করা যাইতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূ পণ করিবার বিষয়েও ব্যবস্থা লইতে হইবে, যাহা দেশি-বিদেশি সহায়তা লাভের ক্ষেত্রে সহায়ক হইতে পারে। ইতিমধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারী, সরকার ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপকভাবে দুর্গতদের পাশে দাঁড়াইয়াছে। ব্যক্তি ও দলগত উদ্যোগও বিশেষভাবে লক্ষ করা যাইতেছে। এই ধরনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাইতেই হয়। আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিবে। ইহা স্বস্তির সংবাদ। কবলিত অঞ্চলগুলিতে বন্যাপরবর্তী সংকট মোকাবিলায় দল-মত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকলে আগাইয়া আসিবে বলিয়া আমাদের প্রত্যাশা। আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কাটাইয়া উঠিয়া বন্যাকবলিত অঞ্চলের মানুষ দ্রুত সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিবে বলিয়া আমাদের কামনা।
