জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টগবগ করিয়া ফুটিতেছে মধ্যপ্রাচ্য। হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণের অগ্ন্যুৎপাত হইতেছে এবং বৃহত্তর ও অধিক বিপর্যয়কর অগ্ন্যুৎপাতের আশঙ্কায় প্রহর গুনিতেছে মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষ। ইসরাইল ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর মধ্যে গত রবিবারের পালটাপালটি হামলার ঘটনায় দুই পক্ষ 'সর্বাত্মক' যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হইবে কি না-তাহা এখনো স্পষ্ট নহে। যদিও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ নেতারা বলিতেছেন, তাহারা আরো একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চাহেন না। তবে উভয় পক্ষই বলিতেছে, যদি যুদ্ধ করিতেই হয় তাহা হইলে তাহার জন্য উভয় পক্ষই প্রস্তুত রহিয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই আশঙ্কা জাগিতেছে, এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ধাবিত করিতে পারে।
ইসরাইল ও লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর মধ্যে গত রবিবারের পালটাপালটি হামলাটি ছিল মর্যাদার লড়াই। কারণ, গত ৩০ জুলাই হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ফুয়াদ শোকর বৈরুতে ইসরাইলি হামলায় নিহত হইবার পর ৩১ জুলাই হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া ইরানের রাজধানী তেহরানে অন্য এক হামলায় প্রাণ হারাইয়াছেন। এমতাবস্থায় লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর ইসরাইলে হামলা করাটা ছিল মর্যাদার বিষয়। সেই কারণে শোকর ও হানিয়া হত্যার পর গত প্রায় ২৫ দিন ধরিয়া হিজবুল্লাহ ও ইরানের নিকট হইতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা ছিল। যদিও হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলা করিলেও ইরানের পক্ষ হইতে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা হয় নাই। ইসরাইলের ১১টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ৩২০টির অধিক কাতিউশা রকেট হামলা চালাইবার পর হিজবুল্লাহর বিবৃতি হইতে ইহা আপাতত স্পষ্ট হইতেছে যে, তাহারা শীঘ্র আর ইসরাইলের উপর এই রকম হামলা চালাইবে না। ইসরাইল অবশ্য বলিতেছে, হিজবুল্লাহ হামলা চালাইবার গোপন সংবাদ পাইয়া ইসরাইল আগেভাগেই দেশটির উত্তর দিক লেবানন সীমান্তে বিমান হামলা চালায়, যাহাতে অন্তত তিন জন নিহত হইয়াছেন।
হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ফুয়াদ শোকর হত্যার প্রতিশোধ লইতে মর্যাদা রক্ষার এই হামলার মধ্য দিয়া হিজবুল্লাহ বলিতেছে, ইহার ভিতর দিয়া হামলার 'প্রথম পর্যায়' সম্পন্ন হইল। ইহার অর্থ হইল, প্রতিশোধের আরো পর্যায় রহিয়াছে। ইরান অবশ্য পূর্বেই জানাইয়াছে, যদি ইসরাইলের সহিত যুদ্ধ বাধিয়া যায়, তাহা হইলে তাহারা হিজবুল্লাহকে সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা দিবে। এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি দৈনিক পত্রিকা 'হারেজ' সম্পাদকীয়তে লিখিয়াছে, (হিজবুল্লাহ ও হামাসের দুই জন কমান্ডারের) এই সকল হত্যাকাণ্ড ও সামরিক চাপ বাড়াইয়া গাজা উপত্যকায় জিম্মি হইয়া থাকা ইসরাইলিদের মুক্ত করা যাইবে না। হামাস ১১৫ জনকে ধরিয়া লইয়া জিম্মি করিয়া রাখিয়াছে, যাহাদের অর্ধেক এখন বাঁচিয়া আছে আর কয়েক জন ছাড়া পাইয়াছেন। একটা সমঝোতা চুক্তিতে না আসিলে বাকিরা ছাড়া পাইবেন না।
এই সংকটময় পরিস্থিতি হইতে উত্তরণের একমাত্র উপায় হিসাবে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও হামাসের সহিত সমঝোতা চুক্তি করিবার কথা বলা হইতেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইতিপূর্বে বলিয়াছেন, তিনি ৩১ মে যেই পরিকল্পনাটির প্রস্তাব (রোড ম্যাপ) করিয়াছিলেন তাহা ইসরাইলের সহিত সমন্বয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হইয়াছিল। ইহার মধ্যে রহিয়াছে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি, জিম্মি-বন্দি বিনিময় এবং গাজার পুনর্গঠন। বিশ্লেষকরা মনে করিতেছেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের রূপরেখা অনুযায়ী জিম্মিদের মুক্ত করা, যুদ্ধের অবসান ঘটানো, সৌদি আরবের সহিত সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আর ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনে সমঝোতা শুরুর মধ্য দিয়াই মধ্যপ্রাচ্যের জীবন্ত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ করা সম্ভব। জো বাইডেনের দেওয়া রোড ম্যাপ অনুযায়ী চুক্তির বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখনো দেখা যাইতেছে না। যুদ্ধ কখনো অধিক রক্তপাতের ভিতর দিয়া বন্ধ হয় না। রক্তপাতের শেষ থাকে না, যদি যুদ্ধ বন্ধের জন্য কার্যকর আলোচনা না হয়। আলোচনার ভিতর দিয়া সমঝোতা ব্যতীত যুদ্ধ কখনো শেষ হয় নাই। এখন, আলোচনা-সমঝোতাই যখন যুদ্ধ বন্ধের প্রধান দাওয়াই, তাহা হইলে এত রক্তপাত কেন? আর কত রক্ত ঝরা শেষ হইলে তাহারা আলোচনায় বসিতে বাধ্য হইবে?
