আমাদের দেশে 'ঘরপোড়ার মধ্যে আলু পোড়া খাওয়া' কথাটি বেশ প্রচলিত। যখন কোনো বিপদ- আপদ নামিয়া আসে কোনো জনপদে, তখন একশ্রেণির সুযোগসন্ধানীর অভাব হয় না। এমনই একটি কথা ইংরাজিতেও প্রচলিত রহিয়াছে। তাহা হইল: Nero fiddles while Rome burns. অর্থাৎ রোম যখন পোড়ে, নিরো তখন বাঁশি বাজায়। সম্রাট নিরো ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম অধিপতি; কিন্তু নাশকাতমূলক অগ্নিকাণ্ডে রোম যখন পোড়ে, তখন তিনি নির্লিপ্ত ছিলেন। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগসন্ধানীদের উপদ্রব যেমন বাড়িয়াছে, তেমনি কোথাও কোথাও সামষ্টিক দায়িত্বহীনতারও পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। বিশেষ করিয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় এই সুযোগকে কাজে লাগাইয়া দুর্বৃত্তরা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির হীন প্রচেষ্টা চালাইতেছে।
সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনীতিকে বাঁচাইতে শিল্প-কলকারখানাগুলির নিরাপত্তা প্রদান জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। গত সোমবার নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের রূপসীতে অবস্থিত গাজী টায়ারে যে ভয়াবহ লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা দুঃখজনক। ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ইহাতে নিখোঁজ রহিয়াছে ১৭৬ জন। নিখোঁজরা বহিরাগত এবং লুটপাটের জন্য কারখানাটিতে প্রবেশ করিয়াছিল চার-পাঁচ শত জন। এক পর্যায়ে বিবদমান দুই গ্রুপের হানাহানিতে অগ্নিসংযোগ করা হইলে অনেকে সেইখানে আটকা পড়েন। এই ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে আট সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। ইতিমধ্যে এই কমিটি সরেজমিনে সেই কারখানা পরিদর্শনও করিয়াছে। এখন কাহারা কীভাবে কারখানাটিতে লুটপাট চালাইল এবং অগ্নিসংযোগ করিল, তাহার সঠিক তদন্ত করা প্রয়োজন। কেননা ইহার কারণে অন্যান্য শিল্প-কলকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়াছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। সেইখানে দুই প্রতিষ্ঠিত শিল্পগ্রুপের মধ্যে চলিয়া আসা দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শত্রুতামূলক আচরণের কারণে এমনটি ঘটিতে পারে। আবার ভূমিদস্যুতার কারণেও ইহাতে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিতে পারে।
ইহার পূর্বে আমরা দেখিয়াছি যে, রাজধানীতে বিভিন্ন বস্তিতে যখন আগুন লাগে এবং বস্তির অসহায় মানুষ ঘর হইতে আসবাবপত্র সরাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে, তখন রাস্তার ধারে রাখা টিভি, ফ্রিজ, হাঁড়ি-পাতিল, চেয়ার-টেবিল এমনকি জামাকাপড় পর্যন্ত চুরি হইতে। আবার কেহ কেহ মানবতার পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইয়া বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। বর্তমানে বন্যাকবলিত মানুষকে সাহায্য করিতে সমগ্র দেশে যে বিপুল সাড়া পড়িয়াছে, ইহা হইতে বুঝা যায়, দেশে সুযোগসন্ধানী ও দুর্বৃত্তরা সংখ্যায় মোটেও অধিক নহে; কিন্তু তাহারা যাহাতে কোনো অন্যায়-অনিয়মের সুযোগ না পায়, সেই প্রচেষ্টাই আমাদের চালাইতে হইবে। এই জন্য সর্বাগ্রে দরকার আইনের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন।
অবশ্য আমরা এই কথা বলিতে পারি নির্দ্বিধায় যে, ৫ আগস্টের পর একটা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন বিপর্যয় দেখা যায় নাই। যেখানে উন্নত দেশেও দেখা যায়, গোলযোগের বিশেষ মুহূর্তে ব্যাপক লুটতরাজের ঘটনা ঘটে। সেই রকম পরিস্থিতি দেশে দেখা যায় নাই যাহা সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই নহে; কিন্তু এখন শিল্প- কলকারখানায় যেই ধরনের অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করিতেছে, তাহা দূর করা প্রয়োজন। বেসরকারি প্রহরীদের উপস্থিতির পাশাপাশি শিল্পপুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি করা আবশ্যক। আলোচ্য অগ্নিসংযোগ ও দুর্ঘটনায় যাহারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা লইতে হইবে। যেহেতু টায়ার তৈরির কাঁচামাল ও রাসায়নিক অত্যন্ত দাহ্য, সেই কারণেই আগুন নিভাইতে সময় লাগিয়াছে। এখন ফায়ার সার্ভিসের উচিত সাবধানতার সহিত উদ্ধারকাজ শুরু করা। কেননা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভবনটি ধসের আশঙ্কাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না।
