'মব জাস্টিস' কাম্য নহে

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৪, ১৯:৫৬

ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতার পট পরিবর্তনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েক জন মন্ত্রী-এমপি ও নেতাকর্মী গত কয়েক দিনে গ্রেফতার হইয়াছেন। আইনি ও বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করা হইতেছে; কিন্তু পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে আদালতে নেওয়ার কিংবা বাহির করিবার সময় আদালত প্রাঙ্গণেই তাহাদের শারীরিক হামলা ও হেনস্তার ঘটনা লক্ষ করা যাইতেছে। ইহাতে স্বাভাবিকভাবেই তাহাদের 'নিরাপত্তা' লইয়া নানাবিধ প্রশ্ন উঠিতেছে। এই প্রবণতাকে ইতিমধ্যে 'মানবাধিকারের লঙ্ঘন' হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন আইন বিশেষজ্ঞগণ। পুলিশের শীর্ষ পর্যায় হইতে অবশ্য বলা হইয়াছে যে অস্বাভাবিক এই সময়ে অনেক কিছুই ঘটিতেছে। যদিও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হইতেছে। সাধারণ মানুষের রাগ-ক্ষোভ-ক্রোধ মিটিয়া গেলে পরিস্থিতি এমনিতেই স্বাভাবিক হইয়া আসিবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশের কথার সহিত দ্বিমত পোষণ করা যায় না। তবে গ্রেফতারকৃতদের আদালতে হাজির করিবার সময় যেই ধরনের 'ক্রাউড' বা ভিড়' লক্ষ করা যাইতেছে, তাহা স্বভাবতই চিন্তার উদ্রেক ঘটায়। এহেন অবস্থায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়া যাওয়াও অস্বাভাবিক নহে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে অনেকের ক্ষোভ থাকিতে পারে, নানাবিধ অভিযোগ- অনুযোগ থাকিতে পারে। সেই সকল বিষয়ের সুরাহার জন্যই তাহাদের আদালত তথা বিচারের মুখোমুখি করা হইতেছে। সুতরাং, সংক্ষুব্ধ হইয়া তাহাদের উপর মারমুখী হওয়া কিংবা কোনোরূপ আচরণগত প্রবণতার বশবর্তী হওয়াটা নানা প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। বরং এই ক্ষেত্রে সকলকে শৃঙ্খলা বজায় রাখিবার ব্যাপারে যত্নশীল হইতে হইবে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হইল, গ্রেফতারকৃতদের প্রায় সকলেই রাজনীতিবিদ। ক্ষমতার পালাবদলে নানা অভিযোগের খড়গ মাথায় লইয়া তাহারা বিচারের সম্মুখীন হইতেছেন। এই সকল ঘটনার উপর দেশ ও বিদেশের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রহিয়াছে, তাহারা গভীরভাবে নজর রাখিতেছে। ফলে এই রকম একটি অবস্থায় আদালতের ন্যায় স্পর্শকাতর জায়গায় গ্রেফতারকৃতদের সহিত কোনোরূপ অন্যায়, অন্যায্য এবং আইনবহির্ভূত আচরণ করা দেশ ও সরকাররের সঠিক ভাবমূর্তির পরিপন্থি হিসাবে গণ্য হইতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সকল কর্মকাণ্ড দেশের মানুষ কীভাবে গ্রহণ করিতেছে, তাহার চাইতে বরং দৃষ্টি দিতে হইবে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইহার কী প্রভাব পড়িতে পারে, কী ধরনের মেসেজ যাইতে পারে তাহার উপর।

ইতিমধ্যে এই ঘটনাকে 'মব জাস্টিস' হিসাবে উল্লেখ করিয়া বলা হইয়াছে, আদালত প্রাঙ্গণে মব জাস্টিস কেন? নিরাপত্তা দিতে না পারিলে অন্য ব্যবস্থা লইয়া তাহাদেরকে আদালতে হাজির করা উচিত। দেশে-বিদেশে প্রথিতযশা কেহ কেহ এই ঘটনায় মন্তব্য করিয়াছেন যে আদালত প্রাঙ্গণে এবং আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাবলি উদ্বেগজনক। যে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার প্রাপ্তি যেমন অধিকার, তেমনি তাহার নিরাপত্তা বিধান সরকারের দায়িত্ব। তবে আশার কথা হইল, সরকার এই বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। খোদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের কথায় তাহা স্পষ্ট। তিনি বলিয়াছেন যে আদালত চত্বরে যেই হামলা হইতেছে, উহা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নহে। আদালতে যাওয়ার সময় আক্রমণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নহে।

দার্শনিক উইলিয়াম গডউইন বলিয়াছেন, 'আইনি বিচার হইল সকল নৈতিক কর্তব্যের সমষ্টি।' বলা হইয়া থাকে, 'আইনের নিয়মে পাওয়া ন্যায়বিচারই সভ্য সমাজের স্থায়ী নীতি।' বস্তুত, প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই নিজস্ব আইন রহিয়াছে এবং তাহা অনুযায়ী যাবতীয় বিচার প্রক্রিয়া সম্পাদিত হয়। আর ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে বিচারকার্য বিঘ্নিত হয়, সৃষ্টি হয় অপ্রত্যাশিত বিশৃঙ্খলা। আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া গণতন্ত্রের জন্যও অত্যাবশ্যকীয়: যেমনটি বলিয়াছেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী-'আইনের শাসনকে অবশ্যই সম্মান করিতে হইবে, যাহাতে আমাদের গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো অটুট ও শক্তিশালী থাকে।' মূলত এই সকল কথার সারবস্তু হিসাবেই সর্বসমাজে আইন নিজের হাতে তুলিয়া না লইবার আহ্বান জানানো হয়। সুতরাং, আদালতে এবং আদালত অঙ্গনে দলমত-ধর্মবর্ণনির্বিশেষে গ্রেফতারকৃত সকলের সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে যত্নবান ও সতর্ক থাকিতে হইবে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন