দেশের তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে গতকাল বুধবারও টানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে অনেক এলাকা তলিয়ে গেছে পানির নিচে। তিন জেলায় প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ভূমিধসের ঘটনা। এতে পাহাড়ে বসবাসকারীদের মধ্যে বিরাজ করছে ধস-আতঙ্ক। খাগড়াছড়িতে ভূমিধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসন এখনো তত্পর পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য। তিন জেলার সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হচ্ছে। এদিকে ফেনীতে পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি উপচে ১৬টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের প্রায় সব কয়টি উপজেলার অনেক এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
খাগড়াছড়ি : গত পাঁচ দিনের টানা বর্ষণে খাগড়াছড়িতে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের উল্টাছড়ি এলাকায় পাহাড়ধসে যোগেন্দ্র চাকমা (৪০) নামে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অবিরাম বর্ষণে খাগড়াছড়ি পৌরসভা, জেলা সদরসহ দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা, মানিকছড়ি, রামগড় ও মহালছড়ির নিম্নাঞ্চলীয় এলাকার তিন শতাধিক গ্রামের ২ হাজার পরিবার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের পুজগাং মধুমঙ্গলপাড়ায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে কমপক্ষে ২৭টি পরিবার গৃহহারা হয়েছে। পানছড়ির লোগাং দুদুকছড়ার ওপর নির্মিত প্রায় ৮০ ফুট দীর্ঘ একটি পাকা ফুটওভার ব্রিজ ধসে পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। মনিপুর-তারাবন পাকা সড়কে ভূমিধসে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। নদীভাঙন তীব্রতর হওয়ায় বিলীন হওয়ার মুখে পানছড়ির চেঙ্গী ইউপি কার্যালয়। বন্যায় বিভিন্ন উপজেলায় সবজিখেত ও বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
খরস্রোতা চেঙ্গী মাইনী ও ফেনী নদীর দুই তীরে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। সড়কের বিভিন্ন অংশে বন্যার পানি ওঠায় এবং পাহাড় ধসে পড়ায় খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের শালবন, মোহাম্মদপুর, ন্যান্সিবাজার, জিরোমাইল, সবুজবাগ, মাটিরাঙ্গার বাইল্যাছড়িতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন জেলার সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সব প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরের সহযোগিতায় সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ১০০ আশ্রয়কেন্দ্র খুলে সেখানে কয়েকশ পরিবারকে শুকনো ও রান্ন করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
বান্দরবান : বান্দরবানের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ দ্বিতীয় দিনের মতো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম- কেরানীহাট প্রধান সড়ক থেকে পানি এখনো নামেনি। তবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানিও কমতে শুরু করেছে। তবে নদীতীরবর্তী কয়েকশ ঘরবাড়ি এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের শঙ্কা বাড়ছে বান্দরবানে। গতকাল সকালে সদরের লেম্বুছড়ি এলাকায় পাহাড়ধসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের আশ্রয়কেন্দ্রে অথবা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে গতকালও।
রাঙ্গামাটি : রাঙ্গামাটির সাতটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে হাজারেরও বেশি মানুষ। অবিরাম বৃষ্টির কারণে রাঙ্গামাটির প্রতিটি পাহাড়ের মাটি খয়ে পড়ছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার বৃষ্টি শুরু হয়। গতকাল সকাল থেকে আবারও ভারী বর্ষণ শুরু হলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়।
আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় মানুষ ঘরে রান্না করে খেয়ে আবার রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরে যাচ্ছে। এদিকে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার মাটি সরে গিয়ে যানবাহন চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান, রাঙ্গামাটি-মারিশ্যা রুটের সব যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় ছড়ার পানির কারণে ভেঙে গেছে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের বিশাল অংশ।
পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় রাঙ্গামাটি জেলার সব কয়টি উপজেলার ইউনিয়ন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা।
দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) : টানা বর্ষণে প্রায় ৩০টি পাড়া ও গ্রাম তলিয়ে গেছে। দীঘিনালা-মেরুং সড়কের বড়মেরুং এলাকায় স্টিলব্রিজ নামক সড়ক ডুবে যাওয়ায় মেরুং ও লংগদুর সঙ্গে দীঘিনালার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
ফেনী : পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানির তীব্র স্রোতে পরশুরাম ও ফুলগাজীর মুহুরী, সিলোনিয়া, কহুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ত্রিপুরার উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পরশুরাম উপজেলার দুর্গাপুরের দুটি স্থানে, শালধরের একটি, ধনিকুণ্ডায় একটি, অলকায় একটি এবং কহুয়া নদীর ব্রিজের পাশে একটিসহ মোট ছয়টি স্থানে মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে পানি দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করছে। ফুলগাজী উপজেলায় মুহুরী নদীর শ্রীপুরে একটি, ঘনিয়ামোড়ায় তিনটি এবং উত্তর দৌলতপুরের তিনটিসহ মোট সাতটি স্থানে পানির প্রবল স্রোতে নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এ দুই উপজেলায় পরশুরামের সাতটি গ্রাম এবং ফুলগাজীতে ৯টি গ্রামসহ মোট ১৬টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এতে কৃষিজমি ও মত্স্য ঘের ভেসে গেছে। এদিকে ফেনী জেলা প্রশাসকের ত্রাণ বিভাগ থেকে দুর্গত এলাকার জন্য ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সিলেট অফিস: পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জামালগঞ্জের কাশিপুর গ্রামে বজ্রপাতে অন্তর নামে এক শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি ৫১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এরই মধ্যে সিলেট বিভাগের অনেক স্থানে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে এবং ভেঙেচুড়ে একাকার। আমন বীজতলা, আউস ও সবজিখেত এবং নিচু এলাকা ডুবে গেছে। গত রবিবার থেকে এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ৭১৭ হেক্টরের আউস ও ৯০ হেক্টর আমনের বীজতলা ডুবে গেছে। পাথরকোয়ারিগুলো ডুবে যাওয়ায় পাথরশ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়েছেন। নদীভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপজেলাগুলোতে হাজারও মানুষ পানিবন্দি।
মৌলভীবাজারের ধলাই ও মনু নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জেলার চার উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে আগাম বন্যা মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি স্থান মেরামত করা হয়। বাঁধের আরো ৩৬টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মেরামতের কাজ চলছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের আনোয়ারপুর ও বালিজুরী বাজারে ৩ ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়টি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। পানিতে ভেসে গেছে সদর উপজেলা, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শতাধিক পুকুরের মাছ। তাহিরপুর উপজেলায় ৫০টি গ্রাম প্লাবিত এবং অর্ধশতাধিক স্কুল বন্ধ হয়ে পড়েছে।
চট্টগ্রাম অফিস : নগরীর আমিন জুট মিল সংলগ্ন টাংকির পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে জেলা প্রশাসন। অভিযানে ঝুঁকিপূর্ণ ৮০টি পরিবারের ঘর উচ্ছেদ করা হয়।
