নাগাল্যান্ড-এর লোককাহিনি

কীভাবে মানুষের সঙ্গে কুকুরের বন্ধুত্ব হলো

আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯, ১৮:২৪

অনেকদিন আগে এক বনে দুই কুকুরছানা বাস করত। একটির নাম অন্তু, অন্যটির নাম মন্তু। অন্তু এবং মন্তু তাদের মা বিচের সঙ্গে খুব সুখে দিন কাটাচ্ছিল।

প্রতিদিন সকালে বিচ খাবারের সন্ধানে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত। বিচ বেরিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্তু-মন্তু খুবই শোরগোল শুরু করত। এতে পাড়াপ্রতিবেশীরা খুবই বিরক্ত হতো।

সন্ধ্যেবেলা বিচ যখন বাড়ি ফিরে আসত তখন প্রতিবেশীরা এসে অন্তু-মন্তুর নামে নালিশ দিত তার কাছে।

নালিশ শুনে বিচ খুবই দুঃখ পেত। তাই একদিন সে তার বাচ্চাদের ডেকে বলল, ‘শোন বাবারা, তোমরা যদি শক্তিশালী এবং জনপ্রিয় হতে চাও, তাহলে তোমাদের দুষ্টুমি ছাড়তে হবে।’

মন্তু জিজ্ঞেস করল, ‘মা, শক্তিশালীদের কাজ কী? তারা কী করে?’

মা খুব ধীরেসুস্থে ছেলেদের বোঝাতে লাগল, ‘বাবা রে, পশুদের মধ্যে একজনকে শক্তিশালী হতেই হয়। যিনি বনের পশুদের বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবেন।’

তারা বিষয়টি বুঝতে পারল। তখন থেকে তারা দুষ্টুমি ছেড়ে দিয়ে শক্তিশালী হবার জন্য শারীরিক কসরত করতে লাগল।

একদিন ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় তাদের মা বাড়ি ফিরে এল। মারা যাবার আগে সে তার ছেলেদের জানিয়ে গেল—একটি শেয়াল তার এ অবস্থা করেছে।

তাদের মা মারা যাবার পর সব পাড়াপ্রতিবেশী তাদের বাড়ি এল। তারা ইতিমধ্যে একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছে।

অন্তু এবং মন্তুকে তারা এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে বলল। সেটা এক্ষুনি। আর এক মুহূর্তও তারা এখানে থাকতে পারবে না।

অসহায় কুকুরছানারা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তাদের মায়ের একজন বন্ধু ছিল। হাতি। অনেক কষ্টে তারা হাতির কাছে গিয়ে উপস্থিত হলো। হাতি তাদের থাকার জাগয়া দিল। কিন্তু বলে দিল, তারা যেন ঘেউ ঘেউ না করে।

কুকুরছানারা অনেক কষ্টেও তাদের পুরনো অভ্যাস ছাড়তে পারল না। দিনের বেলা কোনোমতে তারা নিজেদের সংযত রাখতে পারলেও রাতের বেলায় পারত না। ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠত।

হাতি কুকুরদের এই ডাকাডাকির কারণে ভয় পেত। কারণ এর ফলে বাঘ এসে আক্রমণ করতে পারে।

তাই হাতি তাদের এই বাড়ি খালি করে দিতে বলল।

কুকুরছানা দুটো বাঘের কাছে এসে তাদের সমস্যার কথা বলল। সব শুনে বাঘের খুব মায়া হলো। সে কুকুরছানা দুটোকে তার গুহায় আশ্রয় দিল। বলল, ‘তোরা যখন খুশি ডাকাডাকি করবি। এখন আর কোনো প্রাণীকে ভয় পাবার কোনো কারণ নেই।’

কিন্তু রাতে যখন কুকুর দুটো সজোরে ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করল, বাঘও তখন আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। কারণ তাদের ডাক শুনে এখানে শিকারি এসে  উপস্থিত হতে পারে। বাঘ ভাবল, তখন শিকারি তাকে মেরে ফেলবে।

বাঘ অবশ্য ভুল বলেনি। শিকারিরা তখন প্রচুর পরিমাণে বাঘ শিকার করত।

বাঘের গুহা থেকে এসে তারা একেবারে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ল।

নিরুপায় হয়ে তারা বনে বনে ঘুরতে লাগল আর কাঁদতে লাগল।

হঠাত্ তারা দেখল এক শিকারি তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছে।

তারা চিত্কার করে শিকারির কাছে সাহায্য চাইল। শিকারি তখন কুকুরছানা দুটোকে তার বাড়িতে এনে আশ্রয় দিল।

শিকারির ছেলেমেয়ে কুকুর দুটোকে পেয়ে খুবই খুশি হলো। যখন রাত ঘনিয়ে এল, কুকুর দুটো খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারা অনেক চেষ্টা করল ঘেউ ঘেউ না করে থাকার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে গলা ছেড়ে ডেকে উঠল।

তবে একটা বিষয়ে তারা খুব অবাক হলো। কেউ তাদের ডাকতে নিষেধ করছে না। বরং শিকারি তাদের ডাকাডাকির অভ্যাসের জন্য খুবই খুশি।

সে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কারণ কুকুর এভাবে ডাকাডাকি করলে বাড়িতে কোনো চোর আসবে না। একদিন তারা শিকারির সঙ্গে বনে শিকার করতে এল। এমন সময় তাদের মায়ের হত্যাকারী শেয়ালকে তারা শিকারিকে দেখিয়ে দিল। শিকারি শেয়ালকে হত্যা করল।

কুকুর দুটো খুবই খুশি হলো তাদের মায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে পেরে। তারা শিকারির কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে রইল। এভাবেই কুকুরের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব শুরু হলো।