বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে হজ সফরের সর্বশেষ আয়োজন হয়েছিল ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। আমার জীবনের প্রথম হজে গমনের সৌভাগ্য হয়েছিল স্টিমারযোগে। এই হজ কাবাঘরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত নির্দিষ্ট নিয়মে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে বিভিন্ন হুকুম-আহকাম ও বিধিবিধানের মাধ্যমে পালিত হয়। আল্লা-জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন—স্মরণ করো, যখন আমি ইব্রাহিমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই গৃহের স্থান, তখন বলেছিলাম, আমার সঙ্গে কারো শরীক স্থির কোরো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখো তাদের জন্য যারা তওয়াফ করে। এবং যারা কিয়াম করে, রুকু করে ও সিজদা করে। এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, ওরা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটে করে, ওরা আসবে দূরদূরান্ত পথ অতিক্রম করে (সুরা হজ :আয়াত-২৬-২৭)।
আমরা লক্ষ করি, হজের হুকুমে আল্লা-জাল্লা শানুহু পদব্রজে ও উটে করে লোক হজ করতে আসবে, সে কথা হজরত ইব্রাহিম (আ)কে জানিয়ে দিয়েছিলেন। উটকে বলা হয় মরুভূমির জাহাজ, বিমানকে বলা হয় উড়োজাহাজ আর সমুদ্রপথে চলে পানির জাহাজ। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সমুদ্রপথে হজ করার সৌভাগ্য লাভ করে। আমি ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে স্টিমারযোগে হজে গিয়েছিলাম। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিএন সালাউদ্দিন জাহাজটি আঠারো শত যাত্রী নিয়ে সকাল ১০ ঘটিকায় রওনা হয়েছিল বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে। আমাদের জাহাজ চলছিল উপকূলের কিছুটা দূর দিয়ে। বঙ্গোপসাগরে সূর্য অস্তকালে হাজার হাজার হাঙর দেখা যায়। বিরাট দুটি তিমি আমাদের জাহাজের কাছে ভেসে উঠেছিল। উড়ুক্কু মাছ ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে কখনো জাহাজের পাটাতনে পড়ত। মাছগুলো দেখতে অনেকটা কই মাছের মতো। আমি কলম্বো নগর দেখার সুযোগ পেলাম; তন্ন তন্ন করে সম্পূর্ণ নগরী দেখেছি। ৭০ কিলোমিটার দূরে রত্নাপুর নামক স্থানে হজরত আদম (আ) সাড়ে তিন শ বছর যে পাহাড় চূড়ায় বসে ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে কেঁদেছিলেন, সেই পাহাড়কে খ্রিষ্টানরা অ্যাডামস পিক, হিন্দু-বৌদ্ধরা শ্রীশ্রী পাদম এবং মুসলিমরা বাবা আদম পাদম বলে সম্মান করে।
১৬ আগস্ট রাতে জাহাজ কলম্বো থেকে ছেড়ে যায় সোজা পশ্চিমে সমুদ্রের ঘন নীল পানি চিরে। ২২ আগস্ট জাহাজ এসে পৌঁছাল দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজধানী এডেনে। বিশেষ ব্যবস্থাধীনে এডেনে অবতরণ করলাম। এডেন শহর দেখে ফিরে এলাম জাহাজে। এখান থেকে জাহাজ ছাড়ল, লোহিতসাগরে এসে পড়লাম। শান্ত সাগর কিন্তু ডলফিনে ভরা এই সাগর। প্রচুর পাখি উড়ছে। টুকরো কাঠ ভাসিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে পাখিরা ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে পারে। সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
২৪ আগস্ট বেজে উঠল জাহাজের বাঁশি, ইয়ালামলাম পাহাড় নিকটবর্তী এ বাঁশি এহরাম বাঁধার আগাম খবর দিল। দূর থেকে ইয়ালামলাম পাহাড় দেখে সবাই ইহরাম বাঁধলাম। কিরান হজের নিয়ত করলাম। হজে কিরানকে প্রিয়নবি (স) উত্তম হজ বলেছেন, হজ ও ওমরাহর নিয়ত একসঙ্গে করে ইহরাম বাঁধতে হয়। এবং ঐ ইহরাম ১০ জিলহজ কোরবানি দেওয়ার পর খোলা যায়।
আমরা ২৫ আগস্ট জেদ্দা বন্দরে পৌঁছলাম। দূর থেকে আকাশসমান উঁচু একটি পানির ফোয়ারা দেখে মনে হলো, মা হাওয়া আলাইহাসসালাম যেন আমাদেরকে আঁচল উড়িয়ে আহলান সাহলান জানাচ্ছেন। দুচোখ আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে গিয়েছিল। লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক। যথাসময়ে জেদ্দায় অবতরণ করে ৪০ মাইল দূরে অবস্থিত মক্কা মুকাররমায় গাড়িযোগে এসেছিলাম। হজ সম্পন্ন করে মদিনা মোনাওয়ারায় প্রিয় নবি (স)-এর রওজা শরিফ জিয়ারত করে জেদ্দা ফিরে এসেছিলাম এবং এখান থেকে স্টিমারযোগে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলাম। তারপর বহুবার উড়োজাহাজে হজ করেছি। কিন্তু স্টিমারযোগে হজের যে আনন্দ তা আর পাইনি।
lলেখক :পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। এবং সভাপতি আঞ্জুমানে তোয়াজিয়া
