আস্থার সংকটে শিক্ষক শিক্ষার্থী সম্পর্ক

অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ সারা দেশে ২ হাজার শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারছেন না

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:০০

শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক প্রভাব হারানোর ভয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াননি। অনেক শিক্ষক চাইলেও সাহস করতে পারেননি। ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে যে চিড় ধরেছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষকসহ সারা দেশে ২ হাজার শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারছেন না। জোরপূর্বক পদত্যাগ, অপসারণ, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক ছুটি, কর্মস্থলে অবাঞ্ছিত ও নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন অনেকে। তাদের স্বপদে বহালের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি ও কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক জোট।

গত ২৭ আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টার বরাত দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, শিক্ষকগণ ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। এমন অবস্থা মোটেও কাম্য নয়। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও স্কুল ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিংবডি/ মাউশি কর্তৃক বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষক/কর্মকর্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রেরণ করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ/দপ্তর তদন্ত বা অনুসন্ধান সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গত ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরেকটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ ও হেনস্তা করার বিষয়ে বলা হয়, ‘দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে এখনো শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ ও নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনা ঘটছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।’ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ‘উপদেষ্টা মহোদয় আরও নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, যেসব শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অপকর্মের অভিযোগ আছে, তা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। বেআইনি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী এবং শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।’

গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি নসরুল হামিদ মিলনায়তন সংবাদ সম্মেলনে পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক জোটের আহ্বায়ক আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তব চিত্র তার বিপরীত। এখনো দেশ জুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পদত্যাগ ও হেনস্তা করা চলছে। যা চর দখলের শামিল এবং ফৌজদারি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। এ কারণে আমরা পদবঞ্চিত শিক্ষকেরা কর্মস্থলে যেতে পারছি না। আমাদের বেতন-ভাতাদি বন্ধ। স্ত্রী-সন্তানাদি নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। নির্যাতিত পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকবৃন্দের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানাচ্ছি, দেশব্যাপী শিক্ষক হয়রানি বন্ধ করা হোক। সুস্পষ্টভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অনতিবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের স্বপদে বহাল করে তাদের ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা এই পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকজোট সংগঠনে যুক্ত হয়ে দাবি পূরণে সোচ্চার হই। আমাদের দাবি পূরণ না হলে অচিরেই কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট এক বিস্ময়কর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটেছে। ফলে আজ প্রত্যেক আশাবাদী মানুষের মনে স্বপ্ন জেগেছে। দেশকে নতুন রূপে দেখার ও গড়ার প্রত্যয় বুকে বাসা বেঁধেছে। অথচ সারা দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকবৃন্দকে অপমান, অপদস্থ, হেনস্তা ও মারধর করে জোরপূর্বক পদত্যাগ, অপসারণ, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক ছুটি, কর্মস্থলে অবাঞ্ছিত ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। প্রায় ২ হাজার শিক্ষক পদবঞ্চিত হয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। দেশ জুড়ে এমন ঘটনায় সত্যিই আমরা বিস্মিত, স্তম্ভিত। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গোলাম নবী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলকাছ উদ্দিন আহমেদ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী, ধানমন্ডির বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মো. ইদ্রিস আলী, কুমিল্লার দিদার মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহাদেব চন্দ্র দে, ঢাকার কোতোয়ালীর আনন্দময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাজমা বেগম,  মানিকগঞ্জের দড়গ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সিদ্দিকুল ইসলাম, বনানী মডেল স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। তারা সবাই পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকজোটের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষাবিদরা বলেন, প্রথমে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও সরকারি তরফে শুধু নির্বিকার আচরণই নয়, বৈরিতা যেমন লক্ষ করা গেছে, তেমনি লক্ষ করা গেছে তুচ্ছতাচ্ছিল্যও। ফলে সরকার-সমর্থক শিক্ষকেরা এ আন্দোলনকে সমর্থন করেননি এবং অনেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। তত্কালীন সরকার সমর্থকদের মধ্যে অনেকে নৈতিক ও যৌক্তিকভাবে শিক্ষার্থীদের দাবি সমর্থন করলেও, তারা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এর বাইরে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষক ভয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন।

ইত্তেফাক/এমএএম