পৃথিবীতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা আদর্শ ও মতবাদ রহিয়াছে। গণতন্ত্রসহ যেই কোনো তন্ত্রমন্ত্রের কথাই বলি না কেন, দেশের জনগণকে সুখী করাই হইল তাহার মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই সমাজে বিভিন্ন পথ ও মত থাকিবে; কিন্তু যাহারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিষ্ঠিত থাকিবেন, তাহাদের দায়িত্ব হইল জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করিয়া কিংবা দেশে যথাসম্ভব শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখিয়া সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের গঠনপ্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহা হইলে দেখিতে পাই- যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মূল স্পিরিট হইল ঐক্য। গত দুই শতাব্দী ধরিয়া নানা বৈচিত্র্য ও অনৈক্য অতিক্রম করিয়া অভিবাসীদের এই দেশটি এমন একটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করিয়াছে, যাহা দেশটিকে পৃথিবীর সবচাইতে প্রভাবশালী ও উন্নত দেশে পরিণত করিয়াছে। ইহার মূলে রহিয়াছে ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি-যাহা ম্যাগনা কার্টা, হ্যাবিয়াস কর্পাস আইন, বিল অব রাইটস, ইংল্যান্ডের কমন ল প্রভৃতির মতো কতিপয় আইনকানুন দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। ইহা ছাড়া দেশটির অমূল্য সম্পদ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে দেওয়া হইয়াছে সাম্যনীতি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, সামাজিক চুক্তি এবং অত্যাচারী সরকারের বিরুদ্ধে জনসাধারণের বিদ্রোহের অবিসংবাদী অধিকার। এই অধিকারগুলিকে সুনিশ্চিত করার জন্যই মূলত শাসনব্যবস্থা স্থাপিত হইয়া থাকে। যখনই কোনো শাসক বা শাসনযন্ত্র এই সকল অধিকার বা উদ্দেশ্যপরিপন্থি হইয়া উঠে, তখনই জনগণের সেই শাসনযন্ত্রটিকে পরিবর্তন বা উচ্ছেদ করিয়া তৎস্থলে তাহাদের উপযোগী একটি নূতন শাসনব্যবস্থা স্থাপনের অধিকার জন্মে। যাহার নৈতিক ভিত্তি হইল জনগণের সুখ ও নিরাপত্তা বিধান করা। মোটকথা, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান জনগণের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করিয়া লইয়াছে। ইহাকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে যে, ইহাকে রক্ষা করিতে যুক্তরাষ্ট্রের 'ডিউ প্রসেস অব ল' নীতি ঘোষিত হইয়াছে; অর্থাৎ, যে আইনই হউক না কেন, যদি সুপ্রিম কোর্ট মনে করে যে, ঐ আইন সাম্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার-পরিপন্থি, তাহা হইলে সেই আইন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ বলিয়া ঘোষণা করিতে পারে। ঐক্যবদ্ধ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের ইহাই মূলমন্ত্র, যাহার ভিত্তি হইল বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ।
একজন দক্ষ দেশপরিচালকের উচিত, নাগরিকদের সাধারণ সাদৃশ্য ও স্বার্থগুলি খুঁজিয়া বাহির করিয়া জনগণের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশকে বিভেদ-বিসংবাদ ও হানাহানির হাত হইতে রক্ষা করা; তাহাদের মৌলিক অধিকারগুলির প্রতি যত্নবান হওয়া। লিবারটি বা ব্যক্তিস্বাধীনতা, ফ্রিডম অব স্পিচ বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ফ্রি মুভমেন্ট বা দেশবিদেশে চলাফেরার স্বাধীনতা, ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার অ্যান্ড প্রভারটি তথা ভয় ও দারিদ্র্য হইতে মুক্তি, ভোটের অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করা। অতএব, আমাদের বলিবার বিষয় এই যে, অন্যায়, অনিয়ম ও লুটপাট ইত্যাদি সকল দেশ ও সকল ব্যবস্থায়ই রহিয়াছে কম আর বেশি; কিন্তু কোনো দেশে এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় নহে, যাহাতে উত্তর কোরিয়ার মতো এক দেশ এক নেতার প্রাদুর্ভাব ঘটে। কীভাবে সকলকে ঐক্যবদ্ধ রাখিয়া দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের অধিকতর সুখ ও সমৃদ্ধি আনয়ন করা যায়, সেদিকেই আমাদের অধিক মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। কারণ তাহারা এমন এক পরিবেশ চাহেন, যাহাতে তাহারা নির্ভয়ে ও নিরাপদে পরিবার-পরিজন লইয়া বসবাস করিতে পারেন। ইহা ব্যতীত কেবল শাসকের পরিবর্তন হইবে মাত্র, শাসিতের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হইবে না।
