১০ মিনিটের পথে লাগে তিন ঘণ্টা

হানিফ ফ্লাইওভারে অসহনীয় যানজট

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:৩২

প্রবেশ মুখে বাস-লেগুনা থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, টোল প্লাজায় দীর্ঘসময় ব্যয়, যত্রতত্র দোকান বসানো ও যানবাহন পার্কিং, ট্রাফিক আইন না মানা, ট্রাফিক পুলিশের স্বল্পতা ও ফ্লাইওভারের নিচে সংকীর্ণ সড়কের কারণে অসহনীয় যানজট তৈরি হচ্ছে রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে। মাত্র ১০ মিনিটে যে পথ পাড়ি দেওয়ার কথা, সেটি পার হতে এখন সময় লাগছে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। এতে অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়ছেন মানুষ। বিশেষ করে ঢাকা থেকে যেসব গাড়ি অন্য জেলাগুলোতে যাচ্ছে, তাদের বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলীয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৩০টি জেলার যাতায়াতব্যবস্থা সহজ করে তোলার জন্য ২০১৩ সালের অক্টোবরে চালু হয় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার। প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের উড়ালসড়কটি শনিরআখড়া থেকে যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান হয়ে চানখারপুল গিয়ে শেষ হয়েছে। শুরুর দিকে কেবল চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলীয় জেলার মানুষ ফ্লাইওভারটি দিয়ে যাতায়াত করলেও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর খুলনা-বরিশালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ উড়ালসড়কটির ব্যবহার শুরু করে। ফলে সময়ের সঙ্গে ফ্লাইওভারে গাড়ির চাপও বাড়তে শুরু করে।

প্রতিদিন চারটি পয়েন্ট দিয়ে কয়েক হাজার ঢাকামুখী যানবাহন প্রবেশ করে এই ফ্লাইওভারে। এগুলো হলো—শনিরআখড়া, ডেমরা, সায়েদাবাদ ও ধোলাইপাড়। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলার পরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি শনিরআখড়া পয়েন্ট দিয়ে হানিফ ফ্লাইওভারে প্রবেশ করে। সিলেট ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলার পরিবহন ও যাত্রীরা ডেমরা টোল প্লাজা দিয়ে উড়ালসড়কে প্রবেশ করে। বরিশাল ও খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহন ধোলাইপাড় পয়েন্ট দিয়ে ফ্লাইওভারে ওঠে। এছাড়া সায়েদাবাদ থেকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অঞ্চলের গাড়ি এই উড়ালসড়ক ব্যবহার করে ওঠানামা করছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যে পরিমাণে যানবাহন হানিফ ফ্লাইওভারে প্রবেশ করছে সেগুলো বের হওয়ার চিত্র ভয়াবহ নাজুক! প্রতি মিনিটে এ ফ্লাইওভারে ১০০টির বেশি যানবাহন প্রবেশ করলেও বের হতে পারে না তার অর্ধেকও। ফলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় তীব্র যানজট। যেটা একসময় পুরো ফ্লাইওভারে ছড়িয়ে পড়ে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেঁসে যেতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।

হানিফ ফ্লাইওভারে সব সময় ঢাকামুখী অংশে যানজট লেগে থাকে। এর অন্যতম কারণ ফ্লাইওভার থেকে গাড়িগুলো বের হওয়ার প্রধান দুই পয়েন্ট—গুলিস্তান ও চানখারপুলের নাজুক চিত্র! মূলত এই দুটি টোল প্লাজা দিয়ে সাধারণ যাত্রীরা ঢাকায় প্রবেশ করেন। মাত্র দুই লেনের গুলিস্তান ও এক লেনের চানখারপুলের প্রবেশদ্বারে সব সময়ই যানবাহনের ‘জটলা’ লেগে থাকে। যে কারণে টোল প্লাজার সামনে এসে কচ্ছপের গতিতে এগোতে থাকে পরিবহনগুলো। যাত্রী ও বাসচালকরা মনে করছেন, ফ্লাইওভারে যানজটের পেছনে ট্রাফিক পুলিশেরও দায় রয়েছে।

মৌমিতা পরিবহনের এক চালক বলেন, ‘এখন তো দেশে কেউ কাউরে মানতেছে না। গাড়ি নিয়ে যে যেখানে খুশি ঢুকে যাইতেছে। ট্রাফিক পুলিশও দেখি নির্বিকার। কিছু কয় না। আগে এই ফ্লাইওভার পাড়ি দিতে ২০ মিনিট লাগত, এখন দেড় ঘণ্টাতেও পারি না। গুলিস্তান, গোলাপবাগে গাড়িগুলো নামার পর ইচ্ছামতো টার্নিং নেয়। অনেকে ফ্লাইওভারের গোড়ায় যাত্রী ওঠানামা করায়। পুলিশও কিছু কয় না। তারা যদি ফ্লাইওভার থেকে গাড়ি নামার সঠিক ব্যবস্থা কইরা দিত, এই জ্যাম লম্বা হইত না।’

ফ্লাইওভারে দায়িত্বরতরা বলেন, ‘গত ৫ আগস্টের পর ফ্লাইওভারে গাড়ি চলাচল বেড়েছে। কারণ হলো, যেসব যানবাহনের আগে ঢাকায় ঢোকার অনুমতি ছিল না, সেগুলোও এখন বিনা বাধায় ঢুকছে। গাড়িগুলো গোলাপবাগ, চানখাঁরপুল ও গুলিস্তানে নামার পর যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী তোলার কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। ঐ যানজট এসে ঠেকছে ফ্লাইওভারে। সায়েদাবাদ রেলগেট থেকে যাত্রাবাড়ী মোড় পর্যন্ত সড়কের অবস্থা খুবই করুণ। হানিফ ফ্লাইওভার নির্মাণে সড়কটির মরণদশা। ফ্লাইওভারের পিলার ও মাঝখানের মিডিয়ানের (উঁচু প্রশস্ত জায়গা) কারণে সরু হয়ে গেছে এ রাস্তা। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তাটি ভাঙাচুরা।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন সড়কটি সংস্কার হয় না। যাত্রাবাড়ী মোড়ের অদূরে প্রিন্স চায়নিজ অ্যান্ড পার্ট সেন্টারের সামনের অংশের সড়কে রয়েছে (ফ্লাইওভারের নিচে) তিনটি মিডিয়ান। একটি প্রস্থে ১৭ ফুট ও অন্য দুটি প্রায় ৯ ফুট করে। এর মধ্যে দুটি সড়ক প্রস্থে ৯ থেকে ১০ ফুট। এসব সড়কে একটি বাস চললে সেটিকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। গত বুধবার ‘সাতক্ষীরা লাইন’ বাসের যাত্রী মফিজুর রহমান জানান, প্রায় আড়াই ঘণ্টা এই ফ্লাইওভারের ওপর আটকে ছিলাম। গাড়ি কোনো দিকে সরানোও জায়গা ছিল না। এত যানজটের কারণে দূরদূরান্তের মানুষ অনেক বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যে পরিমাণে গাড়ি এই ফ্লাইওভারে প্রবেশ করছে, সেগুলো বের হওয়ার সময় মাত্র এক লেন ব্যবহার করতে পারছে। মূলত এখানেই জ্যামটা তৈরি হচ্ছে। ফ্লাইওভারের ওপর নতুন কিছু করার তেমন সুযোগ নেই। যানজট কমাতে চাইলে নিচের সড়কগুলোতে এখন বেশি নজর দিতে হবে। প্রথমেই ফ্লাইওভারের নিচের সড়কগুলো সংস্কার করতে হবে, যেন ফ্লাইওভারে গাড়ির চাপ কমে আসে। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি বাড়াতে হবে।

ইত্তেফাক/এনএন