মৌসুমি বন্যায় বেতনাপাড়ের মানুষের চরম দুর্ভোগ

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৪, ১৬:৫৩

মৌসুমি বন্যায় দীর্ঘ দুইমাস ধরে পানিতে ডুবে থাকা তালা উপজেলা ও সাতক্ষীরা সদরের বেতনাপাড়ের শতাধিক গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ চরম আকারে ঠেকেছে। গত ২ দিনের বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ায় সেই দুর্ভোগ আরও বেড়ে গেছে। 

এসব এলাকায় এখনো সরকারি-বেসরকারি এনজিও কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ত্রাণ সামগ্রী আসেনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পানিবন্দী মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো আশ্রয়ণ কেন্দ্রও খোলা হয়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন দুর্গত এলাকার মানুষজন। ফলে তীব্র খাদ্য সংকটসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তালার নগরঘাটা, সদরের ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর, ফিংড়ী ইউনিয়নসহ কুল্যা, বুধহাটা হয়ে আশাশুনি পর্যন্ত বেতনাপাড়ের শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এসব এলাকার মানুষের খাদ্য সংকটের পাশাপাশি, গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

তালার নাগরঘাটা গ্রামের চিত্র। ছবি: ইত্তেফাক

সরকারিভাবে এখনো পর্যন্ত কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না খোলায় এবং ত্রাণসামগ্রী না দেওয়ায় পানিবন্দী মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এখনো পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধিও তাদের খোঁজখবর না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। 

গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে বালুইগাছা গ্রামের আব্দুল মাজেদ, আব্দুল্লাহ, মহব্বত আলী, ইসলামসহ একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোট এলে গরীবের বন্ধু, সমাজসেবক, জনদরদী লোকের আনাগোনায় এসব জনপদ মুখরিত থাকে। তারা এখন কোথায়? এসব এলাকায় স্যানিটেশন ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তালার নগরঘাটা ও সাতক্ষীরার ধুলিহর, ব্রহ্মরাজপুর ও ফিংড়ি ইউনিয়নের পাশাপাশি বেতনাপাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বসতবাড়িসহ গ্রামের পর গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন। এসব এলাকায় মাটির তৈরি ঘরগুলো পানির চাপে ভেঙে যাচ্ছে। মানুষ মারা গেলে দাফন করার জন্যও তীব্র বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। 

টানা বৃষ্টিপাতে বেতনা নদীর জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেঁড়িবাধের দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। সেখানে বাঁশ ও জিও ব্যাগসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে মেরামত করা হয়েছে।

—মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী, সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২। 

সম্প্রতি অতি ভারীবর্ষণে সাতক্ষীরা সদরের বেতনাপাড়ের শতাধিক গ্রামের স্থায়ী জলাবদ্ধতা যেন ‘মরার পর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২দিন ধরে বৃষ্টির কারণে নগরঘাটা ইউনিয়ন থেকে শুরু করে ধুলিহর ইউনিয়নের স্থায়ী জলাবদ্ধতা দামারপোতা, বাগডাঙ্গা, বড়দল, জিয়ালা, গোবিন্দপুর, নাথপাড়া, কাজিরবাসা, তালতলা, বালুইগাছা, ধুলিহর সানাপাড়া, জাহানাবাজ, কোমরপুর, দরবাস্তিয়া এবং ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের অধিকাংশ জায়গায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। 

এছাড়াও ফিংড়ী ইউনিয়নের ফয়জুল্যাপুর, বালিথা, শিমুলবাড়ীয়া, এল্লারচর, ফিংড়ী, গাভা, ব্যাংদহা, জোড়দিয়া, গোবরদাড়ী, সুলতানপুর, মজলিসপুর, হাবাসপুর ও কুলতিয়াসহ ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের মাছখোলা, নুনগোলা, রামচন্দ্রপুর, চেলারডাঙ্গা, বড়খামার, মেল্লেকপাড়া, উমরাপাড়া বাঁধনডাঙ্গাসহ অনেক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

এলাকার বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চরম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক। 

প্রতিবছর জলাবদ্ধতার কারণে ধুলিহর ইউনিয়নের বালুইগাছা গ্রামের পালপাড়ায় মৃৎশিল্প হাড়ি, পাতিল, কলস, টালিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরির মাটি ও কারখানা পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প বিলুপ্তি হওয়ার উপক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছ। 

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, টানা বৃষ্টিপাতে বেতনা নদীর জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেঁড়িবাধের দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। সেখানে বাঁশ ও জিও ব্যাগসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি দিয়ে মেরামত করা হয়েছে।

তালা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শেখ মো. রাসেল জানান, বেতনা নদীর বাধ ভেঙে নগরঘাটা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে পানি ঢুকে প্লাবিত হয়। ইতোমধ্যে খালের নেটপাটা অপসারণ করা হয়েছে। এলাকা থেকে পানি সরতে শুরু করেছে। অনেক পরিবারকে খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে। 

ইত্তেফাক/এসএএস