অপরাধ নিবারণ, জনব্যবস্থাপনা ও পুলিশের ভারী অস্ত্র

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৪, ০৫:২০

বর্তমান সময়ের এক আলোচিত বিষয় হলো বপুলিশের বড় অস্ত্র বা মারণাস্ত্র থাকা বা না থাকা নিয়ে। আমি সবার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, সর্বাগ্রে আমাদের ভালো মানুষ তৈরি করতে হবে এবং অস্ত্রের পেছনের মানুষটাকে ঠিক করতে হবে, 'Man behind the gun'-কে ভালো হতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। অতীতেও দেখা গেছে, যে সমাজের লোকেরাই মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে-তাদের বিবেক, উপলব্ধি, দেশের জনগণের প্রতি ও দেশের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ব যদি না থাকে; তাহলে তারা সে অস্ত্রকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে না। এজন্য অস্ত্র ব্যবহারকারীকে মূল্যবোধ, মানবাধিকার, শুদ্ধাচার, মানুষকে ভালোবাসা ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত ব্রিফিং এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। আবার অনেকে বলছেন, শুধু পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিটসমূহের হাতে চাইনিজ রাইফেল বা বড় অস্ত্র বা মারণাস্ত্র থাকবে।

আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলছি, আমাদের দেশের পুলিশ যে সমস্ত সমস্যা মোকাবিলা করে, তার মধ্যে আবেগপ্রবণ জনতা-ব্যবস্থাপনা, জনতার গতিময়তা ও জনতা নিয়ন্ত্রণ অন্যতম। আমি তিনটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (সাবেক দাঙ্গা দমন বিভাগে) কাজ করেছি। এক্ষেত্রে বলি, জনতা নিয়ন্ত্রণে ফোর্স কনটিনিউয়াম (শক্তি ব্যবহারের ধারাবাহিকতার গাইডলাইনে)-এর শেষ পর্বে বড় অস্ত্র বা মারণাস্ত্র ব্যবহার করার কথা বলা আছে। 

তবে সেক্ষেত্রে জনতাকে চলে যাওয়ার প্রয়োজনীয় সময়, সতর্ক করা, ফাঁকা গুলি করা ইত্যাদি প্রক্রিয়া অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। তাছাড়া জাতিসংঘের শক্তি প্রয়োগের নীতিমালা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে; অর্থাৎ সর্বনিম্ন শক্তি প্রয়োগ, সমানুপাতিক হারে শক্তি প্রয়োগ বা আইনসিদ্ধভাবে শক্তি প্রয়োগ ও তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বলে রাখি, জাতিসংঘের শক্তি প্রয়োগের নীতিমালায় জবাবদিহির ক্ষেত্রে শুধু যারা শক্তি প্রয়োগ করছে, তারা নন, যারা পরিকল্পনাকারী, যিনি তার কমান্ডার, নির্দেশদাতা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী, তারাও দায় এড়াতে পারে না। যাহোক, জনতা-ব্যবস্থাপনা ও জনতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত বাহিনীসমূহের ব্যবহারের কারণে সমস্যা আরো বেশি প্রকট হয়ে থাকে এবং ইতিপূর্বে আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। বাস্তবধর্মী প্রশিক্ষণ দিয়ে থানা-পুলিশকে দিয়েই ভালো এবং অর্থবহ ফলাফল পাওয়া সম্ভব। বর্তমান সময়ে পুলিশকে সন্ত্রাসবাদ দমন করতে অনেক সময়, শক্তি ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণের তিনটি উপায় রয়েছে- প্রথমত, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ, যেখানে সন্ত্রাসকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তার কৃতকর্মের জন্য মামলা নেওয়া হয়; পরে আদালতের মাধ্যমে বিচার করে জেলে পাঠানো হয় এবং সবশেষে কারাগারে রেখে সংশোধন করা হয়। দ্বিতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ বা যুদ্ধ মডেল; যেখানে সন্ত্রাসবাদকে কম তীব্রতর সংঘর্ষ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের গুলশানে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের হোলি আর্টিজান বেকারির অভিযান উল্লেখ করা যায়। সর্বশেষটি হলো জনস্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণ: এক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদকে রোগের সঙ্গে তুলনা করা হয়, যেখানে প্রথমে সন্ত্রাসবাদের কারণ বা রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত প্রতিকারের ওপর জোর দেওয়া হয়। 

বিশেষজ্ঞদের মতে তিনটি উপায় বা পন্থারই কম বেশি প্রয়োজন রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের উপলব্ধি হলো থানা-পুলিশকে দিয়েই যৌক্তিক ও সর্বনিম্ন মাত্রায় শক্তি প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব। এখন আসা যাক, বাংলাদেশ পুলিশকে কারা মারণাস্ত্র দিল? সূত্র থেকে জানা যায়, ব্রিটিশই প্রথম এ দেশের পুলিশকে 'থ্রি নট থ্রি রাইফেল' দেয়। এখন ২০০ বছরের একটা বিষয়কে রাতারাতি পরিবর্তন করা কতটুকু যৌক্তিক হবে, সেটাও ভেবে দেখা উচিত। আর যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে একটু ফিল্ড বা মাঠে যারা কাজ করে, অর্থাৎ 'এমফেরিক্যাল ওয়ার্ল্ড' থেকে তথ্য নিলে ভালো হয় মর্মে বিশেষজ্ঞদের উপলব্ধি। পুলিশের কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, অপরাধ নিবারণ করা।

সেজন্য বড় অস্ত্র বা চাইনিজ রাইফেল না থাকলে সন্ত্রাসীরা ভয় পাবে না। এক্ষেত্রে বড় অস্ত্র এক প্রকারের প্রতিরোধক (ডিটারেন্ট) হিসেবে কাজ করে থাকে। যদি সন্ত্রাসীর কাছে পুলিশের থেকে বড় অস্ত্র থাকে, তাহলে পুলিশ কিন্তু সন্ত্রাসী ধরতে পারবে না কিংবা টেকসই আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা কষ্টকর হবে। এক্ষেত্রে বড় অস্ত্র ডিটারেন্ট হিসেবে কাজ করবে। উল্লেখ্য যে, ক্লাসিক্যাল ক্রিমোনলজিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিটারেন্টের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ যদি ছোট অস্ত্র বা শর্টগান বা লাঠি নিয়ে ডিউটি করে, তাহলে অপরাধী, সংঘবদ্ধ অপরাধী ও সন্ত্রাসবাদ দমন করতে ডিটারেন্ট ব্যবস্থা কিছুটা অকার্যকর হয়ে যাবে। 

আবার অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, পুলিশকে শুধু লাঠি দিতে হবে। আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে জানাচ্ছি, পুলিশকে লাঠি দেওয়া যাবে তখনই, যখন আমাদের সব স্তরের মানুষ মনমানসিকতায় উন্নত হবে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বেশ কিছু দিন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর বিভাগের ট্রাফিকের দায়িত্বে ছিলাম এবং প্রায়ই মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। ঐ সময় দেখেছি, অধিকাংশ মানুষ আইন মানতে চায় না এবং ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। সেজন্য প্রশিক্ষণপ্রতিষ্ঠান থেকে সদ্য ডিএমপিতে যোগদান করা নবীন পুলিশ সদস্যরা ট্রাফিকের ডিউটি করতে রাজি হতো না। বলে রাখি, কিছু কিছু বড় কর্তা ও ধনী ব্যক্তিই বেশি ট্রাফিক আইন অমান্য করতেন এবং তাদেরকে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে দেখেছি; অথচ ইংল্যান্ডের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে যদি কোনো পুলিশ সদস্য টেলিফোন বা যে কোনো উপায়ে জানায় যে, আপনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আছে, সে অভিযুক্ত তা জানা মাত্রই তৎক্ষণাৎ পুলিশের কাছে চলে যায়। তাছাড়া তারা পুলিশকে আদর করে 'ববি' বলে ডাকেন এবং 'পুলিশ আসাকে' বলেন 'ল আসছে'। 

আমাদের অপরাধ দমন করার পরিবর্তে অপরাধ নিবারণের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। পৃথিবীর অধিকাংশ এবং বলতে গেলে কোনো দেশেই এখন আর দাঙ্গা দমন বিভাগ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকে প্রথম জনতা নিয়ন্ত্রণে আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়াস শুরু হয়। তারপর ১৯৯০-এর দশকে দাঙ্গা দমন বিভাগকে জনতা ব্যবস্থাপনা বিভাগে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশেও ২০০৬ সালে 'দাঙ্গা দমন' বিভাগকে 'পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট' বিভাগে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশের আবেগপ্রবণ জনতা-ব্যবস্থাপনা ও জনতা নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই দরকার দেশব্যাপী কয়েক শত 'মব সাইকোলোজি বা আবেগপ্রবণ জনতা ব্যবস্থাপনার এক্সপার্ট বা বিশেষজ্ঞ তৈরি করা'-এটা মাত্র তিন মাসেই তৈরি করা সম্ভব এবং তাদেরকে প্রত্যেক জেলার পুলিশ লাইনস, থানা, ফাঁড়ি, তদন্তকেন্দ্র এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন্সে পদায়ন করা ও একটা সময় পরপর এক্সারসাইজ করানো যেতে পারে। এছাড়া আমাদের সবার মধ্যে বিবেক ও উপলব্ধি জাগ্রত করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে একটু আলোকপাত করা যাক আন্দ্রে শাখারভের বিষয়ে; তাকে বলা হয় প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়েনের হাইড্রোজেন বোমার জনক। তিনি পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা এবং তার বিপদ ও ক্ষতি মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে, সেলক্ষ্যে এক সচেতনা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। সেজন্য তিনি জীবনের শেষের দিনগুলিতে একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে কাজ করে গেছেন এবং ১৯৯৫ সালে নোবেল পুরস্কার পান। আন্দ্রে শাখারভের পথ ধরে আমরাও আমাদের বিবেক, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও উপলব্ধি ফিরিয়ে আনতে পারি।

লেখক: কমান্ড্যান্ট (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল, বেতবুনিয়া, রাঙ্গামাটি

ইত্তেফাক/এনএন