আমরা ‘মানুষ’ হয়ে উঠব কবে

আপডেট : ০৯ মে ২০২৫, ১৭:২১

পশু হয়ে জন্মাবার বড় সুবিধা হলো জন্মসূত্রে পণ্ড হওয়া যায়। পশুদের ধর্ম পশুত্ব। জন্ম থেকেই এই সত্তার সব বৈশিষ্ট্যই পেয়ে থাকে তারা, আলাদাভাবে অর্জন করে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অন্যদিকে, জন্মসূত্রে মানুষ হওয়া যায় না, তথা মানুষের পেটে জন্ম নিলেই মানবীয় সত্তাকে ধারণ করা যায় না। মানুষ হতে হয় কর্মসূত্রে। মনুষ্যসত্তা এমনিতেই আসে না, তাকে অর্জন করে নিতে হয়। 

মানুষ তার দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায় যত জ্ঞান, গরিমা, শিক্ষা, তত্ত্ব, দর্শনের সম্মুখীন হয়-সব ক্ষেত্রে গুরুত্ব থাকে এই মানবীয় সত্তা, অর্থাৎ মনুষ্যত্বের শিক্ষায় তাকে শিক্ষিত করে তোলা। সহজ কথায়, মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, মনুষ্যত্বকে অর্জন করে মানুষ হয়ে ওঠা। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, ‘আক্ষরিক’ মানুষের জন্ম হয় ‘বাস্তবিক’ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। কিন্তু এই সহজ ব্যাপারটিকে আমরা আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বাস করি; বাস্তবিকে নয়। 

‘আক্ষরিক’ ও ‘বাস্তবিক’ মানুষের মাঝামাঝিতে অবস্থান করে প্রেম, মমতা, ভালোবাসা, বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সদাচার, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা-এক কথায়, জগতের সব মহৎ গুণ। আর এসবই মনুষ্যত্বের একেকটি স্তর। মনুষ্যত্ব আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত। আত্মা হলো পবিত্রতম। অন্তরের পবিত্রতা অর্জন করলেই মনুষ্যত্ব অর্জিত হয়। মনুষ্যত্ব বিবর্জিত মানুষেরা কেবল আক্ষরিক অর্থেই মানুষ হয়; বাস্তবিক মানুষের গুণাবলি ধারণ করে না। এই শ্রেণির মানুষ সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব এমনকি নিজের জন্যও হয়ে ওঠে ভয়ংকর! 

মানুষের বেলায় মনুষ্যত্বহীন শব্দটি শুনতে পাওয়া গেলেও পশুর ক্ষেত্রে পশুত্বহীন শব্দের ব্যবহার নেই। যেহেতু জন্ম থেকেই পশুরা তাদের স্ব-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো পেয়ে থাকে; তাই কখনোই তাদের সত্তার বৈশিষ্ট্যের রদবদল ঘটে না। আর এজন্য তাদের ক্ষেত্রে এ শব্দেরও প্রয়োজন পড়ে না। পশুরা জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি তাদের পশুত্ব সত্তার ওপরেই প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাহলে পশুদেরই তো জগতের শ্রেষ্ঠ জীব বলা উচিত ছিল! তাহলে মানুষকে কেন এই উপাধি দেওয়া হয়? 

কারণটা হলো, মানুষকে সত্তার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যা পশুকে দেওয়া হয়নি। পশুর জন্য তার সত্তা নির্দিষ্ট, সে ইচ্ছা করলেই তা পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে না। ফলে তার জীবন থাকে নিয়মতান্ত্রিক এবং একটি গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু মানুষকে কোনো গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। মানুষ চাইলেই যে কোনো সভার বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে পারে-মনুষ্যত্বেরও, আবার পশুত্বেরও। পাশাপাশি কঠোর সাধনার মাধ্যমে ধারণকৃত সত্তার পরিবর্ধন ঘটিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়েও যেতে পারে। অর্থাৎ মানুষের পক্ষে যেমন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ভালো কাজটি করা সম্ভব, তেমনি সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট কাজটি করাও সম্ভব। নিজেকে জাগতিক ও মহাজাগতিক কল্যাণের কাজে নিযুক্ত করা যেমন সম্ভব, তেমনি ধ্বংসাত্মক কাজে প্রবুদ্ধ হওয়াও সম্ভব। এ প্রবণতা পশুদের মধ্যে নেই। 

মূলত, এই ভালো বা খারাপ কাজ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে থাকে ‘বিবেক’। বিবেক আক্ষরিক মানুষকে বাস্তবিকে পরিণত করে। আর এই বিবেককে পরিশীলিত করে মনুষ্যত্ব। এজন্য মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব বলা হয়। এখন বিবেকের দরজায় টোকা দিয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, সত্তা নির্বাচনের স্বাধীনতা পেয়ে আমরা স্বীয় সত্তায় প্রতিষ্ঠিত আছি কি? বিবেক জবাব দেওয়ার আগে জবাব দেবে আমাদের সমাজ, সামাজিকতা, পারিপার্শ্বিকতা। তারা জানাবে এ সমাজে, এ সভ্যতায় হত্যা, খুন, গুম, ধর্ষণ, রাহাজানি, মিথ্যাচার, অনাচার, অবিচার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির যে বিকৃত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে, মানুষের মনুষ্যসত্তা বিলুপ্তির পথে। 

একইভাবে বিবেক বলবে অর্থ, ক্ষমতা, লোভের সম্ভার এতই শক্তিমান হয়ে উঠছে যে, বিবেকের বোধ পরাস্ত হচ্ছে, থমকে দাঁড়াচ্ছে। তাদের এমন মন্তব্য প্রমাণ করে, আমাদের মানষিকতা এখনো আটকে আছে সেই আক্ষরিক মানুষের চক্করেই। ম্রিয়মাণ হয়ে আছে আমাদের মানুষ হয়ে উঠার সব প্রচেষ্টা। আমরা না জন্মসূত্রে মানুষ হচ্ছি, না কর্মসূত্রে।

বর্তমান পৃথিবীতে ‘আক্ষরিক’ মানুষের সংখ্যা ঢের বেশি বাস্তবিকদের তুলনায়। অথচ পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে বাস্তবিক মানুষের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, যাদের প্রেম, মায়া, মমতা, ভালোবাসায় সিক্ত হবে ধরণী, পরিশীলিত হবে হৃদয়।  

লেখক: শাকিরুল আলম শাকিল, দৈনিক ইত্তেফাকের সহসম্পাদক। 

ইত্তেফাক/এসএএস