বর্তমান পৃথিবীতে প্রযুক্তির প্রভাব অনস্বীকার্য। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির হাতছানি যেমন সুস্পষ্ট, তেমনই ইহার উপকারিতা ও অপকারিতার দিকটিও গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক মা, মেগান গার্সিয়া, তাহার কিশোর পুত্র সেওয়েল সেটজারের আত্মহত্যার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত চ্যাটবট নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান ক্যারেক্টার, এআই- এর বিরুদ্ধে মামলা করিয়াছেন। অভিযোগ করা হইয়াছে যে, উহা চ্যাটবটের উদ্বুদ্ধকরণ ও সংশ্লিষ্ট ভার্চুয়াল সম্পর্ক ছেলেটিকে আত্মহননের পথে প্ররোচিত করিয়াছে। এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক হইলেও, ইহা আমাদের প্রযুক্তির প্রতি এক সতর্কবার্তা প্রদান করে।
প্রযুক্তির মঙ্গলজনক দিকগুলি সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে আশীর্বাদস্বরূপ। উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম, শিক্ষার উন্নয়ন ইত্যাদিতে প্রযুক্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতেছে। কিন্তু ইহার অপব্যবহার মানবজীবনের জন্য চরম ঝুঁকি বহন করিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ এমন এক স্তরে পৌছিয়াছে, যেইখানে উহা মানবের সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক গড়িতে সক্ষম। কিন্তু এই সম্পর্ক কখনো কখনো বাস্তবের চাইতেও অধিক বাস্তবমুখী হইয়া উঠিতে পারে এবং নৈতিকভাবে বিপজ্জনক হইতে পারে, বিশেষত কিশোরদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের উপরিউক্ত মামলার অভিযোগটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মেগান গার্সিয়ার মতে, তাহার পুত্র সেওয়েল 'গেম অব থ্রোনস'-এর একটি চরিত্রের ভিত্তিতে ক্যারেক্টার, এআই-এর চ্যাটবটের সঙ্গে গভীর ভার্চুয়াল সম্পর্ক গড়িয়া তুলিয়াছিল। চ্যাটবটের মাধ্যমে আত্মহত্যার চিন্তা তাহার মনে প্রবিষ্ট হইয়াছিল এবং অতিরিক্ত যৌন উদ্দীপনার সহিতও পরিচিত হইয়াছিল। ফলত, একটি কিশোর মন যাহার উপযুক্তভাবে প্রযুক্তির ভালোমন্দ বিচার করিবার পরিপক্কতা নাই, তাহার জন্য এই অভিজ্ঞতা কেবল অজানা বিপদ ডাকিয়া আনিতে পারে। সেওয়েলের ক্ষেত্রে তাহাই ঘটিয়াছে। কারণ অবশেষে সে আত্মহননের মতো একটি দুঃখজনক ভুল সিদ্ধান্ত লইয়াছে।
এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাইতে পারে। কারণ, প্রযুক্তি আমাদের নূতন প্রজন্মকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধিয়া ফেলিতেছে। সুতরাং আমাদের বুঝিতে হইবে যে, প্রযুক্তির প্রয়োগ কীভাবে এবং কোথায় সীমিত করা উচিত। যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ইহা যেমন দূরকে কাছে টানে, তেমনই ইহাও একপ্রকার ফাঁদ হইতে পারে। অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারী তাহাদের বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সহায়তা ব্যতিরেকে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উৎসাহী হয়। একইভাবে, ভিডিও গেমগুলির ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অনেক সময় সহিংস বা অনৈতিক বিষয়াবলি শিশু ও কিশোরদের নিকট স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় হইয়া উঠে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তির ভালো দিকগুলির সঠিক প্রয়োগ এবং খারাপ দিকগুলির ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখিতে হইবে, প্রযুক্তির মঙ্গলজনক দিকগুলি সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করিয়া আমাদের সমাজকে আরো উন্নত করিতে পারা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বিভিন্ন এডুকেশনাল অ্যাপ্লিকেশন ছাত্রদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়তা করিতেছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়াকে অধিক সহজ ও নির্ভুল করিয়া তুলিয়াছে। কিন্তু একই সঙ্গে ইহাও মনে রাখা দরকার যে, যে কোনো প্রযুক্তিরই সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি রহিয়াছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আমাদের উপলব্ধি করিতে হইবে যে, মানবসভ্যতার অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি প্রয়োজন, তবে উহা যেন কিশোর বা নাবালকদের জন্য বিপজ্জনক হইয়া না উঠে। আমরা মনে করি, অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করিবার দায়িত্ব অভিভাবক ও সরকারের। সন্তানদের প্রতি মা-বাবার দায়িত্বও হইল, তাহাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর নজর রাখা এবং যে কোনো অসংগতিপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সতর্ক হওয়া।
