অধ্যাপক ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশকে ঢেলে সাজানোর যেসব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন করে সেটা লেখা। এই পুনর্লিখন বলতে যা আমরা বুঝে থাকি, তা হলো নতুনভাবে একটি সংবিধান রচনা করে সেটা কার্যকর করা। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিটি বিলম্ব না করে কাজ শুরু করে দিয়েছে বলে ধারণা করা যায়। কেননা সরকারের প্রচারিত ঘোষণা অনুযায়ী সব কয়টি সংস্কার কমিটিকেই ৯০ দিন সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করে চূড়ান্ত ফলাফল সরকারের কাছে দাখিল করতে হবে।
অন্য পাঁচটি কমিটি নিয়ে মন্তব্য করার তেমন বিশেষ কিছু এ কারণে দেখছি না যে, সেসব বিষয়ে আমার জ্ঞান সীমাবদ্ধ বলে মনে করি। তবে জাপানে দীর্ঘ ২৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে সংবিধান নিয়ে অল্পবিস্তর পড়াশোনা করতে হয়েছে বলে সংবিধান রচনা নিয়ে সামান্য কিছু মন্তব্য করাকে আমি যুক্তিসংগত মনে করছি।
প্রথমেই বলতে হয় সংবিধান হচ্ছে যে কোনো একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল, রাষ্ট্রের গঠন পরিচয় ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নির্ধারণ করে দেওয়ার বাইরে অন্যান্য অনেক বিষয়ের মধ্যে নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্বের বিস্তারিত বর্ণনার উল্লেখ যেখানে থাকে। ফলে দেশের নাগরিক সম্প্রদায় হচ্ছে সংবিধানের মূল লক্ষ্য। আর এ কারণেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সংবিধান প্রণয়ন কিংবা এর সংশোধন প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অবশ্যই যুক্ত রাখা হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সাংবিধানিক সংসদ হচ্ছে সেই নাগরিক সংযুক্তির একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। বিশ্বের কোনো দেশেই সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পূর্ণভাবে বাইরে রেখে পছন্দমতো বেছে নেওয়া কিছু লোকজনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না।
ব্যতিক্রম হিটলার। ১৯৩৩ সালে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পার্লামেন্টে প্রাধান্য বজায় রাখা সমাজ-গণতন্ত্রীদের কূটচালের মধ্য দিয়ে রাজি করিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন হিটলার। সোশ্যাল ডেমোক্রেটি দলের নেতারা মনে করেছিলেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হয়ে সামরিক বাহিনী ত্যাগ করা সেনাবাহিনীর নিম্ন পর্যায়ের করপোরালকে পরোক্ষে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা কঠিন কাজ হবে না। কিন্তু হিটলার যে ছিলেন এদের চাইতে অনেক বেশি সেয়ানা, তা তিনি অল্প দিনেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে নিয়ে অন্যদের রাষ্ট্রক্ষমতার কাঠামো থেকে সম্পূর্ণভাবে বিতারিত মেইজি জাপানের সংসদকে পুনরায় সচল করে নিয়ে সেই সংসদের হাতেই নতুন একটি সংবিধান রচনা ও সেটা কার্যকর করার দায়িত্ব তারা ছেড়ে দিয়েছিলেন। নতুন সেই সংবিধান রচনার প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রশাসন পরোক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও মূল দায়িত্ব কিন্তু ছিল মেইজি সংসদের হাতে। ফলে নতুন যে সংবিধান ১৯৪৮ সাল থেকে জাপানে কার্যকর হয়, সেটা ছিল ১৮৯০ সালে কার্যকর হওয়া পূর্ববর্তী মেইজি সংবিধানের একটি সংশোধন, যদিও সেই সংবিধানের খোলনলচে সবটাই প্রায় পুরোপুরি বদল করে নেওয়া হয়েছিল করার মধ্য দিয়ে।
পরবর্তী সময়ে যে পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন তা হলো, নিজের এবং নাৎসি দলের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনায় এমন একটি সংবিধান রচনা করা, যাতে নাৎসি মতাদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরবে। হিটলারের সেই সংবিধান রচিত হয়েছিল নিজের বেছে নেওয়া কিছু লোকজনের হাতে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্যদের দিয়ে নয়। এর ফলাফল পরবর্তী সময়ে কী হয়েছিল, তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। ফলে সংবিধানের মতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল রচনা কিংবা সেটা সংশোধন করে নেওয়া নিজের হাতে বেছে নেওয়া গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এক পদক্ষেপ। এ কারণেই বিশ্বের কোনো দেশেই সেরকম পদক্ষেপ গ্রহণের দৃষ্টান্ত পরবর্তী সময়ে আর দেখা যায়নি। আমার জানা নেই, বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখনের জন্য বাছাই করে নেওয়া কিছু লোকজনের হাতে সেই দায়িত্ব যারা ছেড়ে দিচ্ছেন এবং সেই দায়িত্ব পালনে যারা অতি উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন, ইতিহাসের বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি তারা ভেবে দেখেছেন কি না। এক্ষেত্রে জাপানের একটি দৃষ্টান্ত আমার নিজস্ব চিন্তা বা দুশ্চিন্তা পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ছিল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা একটি দেশ। মার্কিন দখলদার বাহিনীর উপস্থিতি ছিল দেশ জুড়ে সর্বত্র। তবে মার্কিন বাহিনীর সেই দলে রুজভেল্টের নিউ ডিল ভাবনায় অনুপ্রাণিত কিছু ব্যক্তিত্ব নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ে আসীন থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছিলেন, তা হলো এমন একটি সংবিধান জাপানের জন্য ঠিক করে নেওয়া, যা ভবিষ্যতে দেশকে যুদ্ধবাজ নেতৃত্বের খপ্পরে পড়ে যাওয়ার মতো বিপদ থেকে রক্ষা রবে। একই সঙ্গে আরো যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের ভাবনায় ছিল, তা হলো-নতুন সেই সংবিধান জাপানের নির্বাচিত লোকজনেরই রচনা করে নিতে হবে।
ফলে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে স্থগিত থাকা মেইজি জাপানের সংসদকে পুনরায় সচল করে নিয়ে সেই সংসদের হাতেই নতুন একটি সংবিধান রচনা ও সেটা কার্যকর করার দায়িত্ব তারা ছেড়ে দিয়েছিলেন। নতুন সেই সংবিধান রচনার প্রক্রিয়ায় মার্কিন প্রশাসন পরোক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও মূল দায়িত্ব কিন্তু ছিল মেইজি সংসদের হাতে। ফলে নতুন যে সংবিধান ১৯৪৮ সাল থেকে জাপানে কার্যকর হয়, সেটা ছিল ১৮৯০ সালে কার্যকর হওয়া পূর্ববর্তী মেইজি সংবিধানের একটি সংশোধন, যদিও সেই সংবিধানের খোলনলচে সবটাই প্রায় পুরোপুরি বদল করে নেওয়া হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে সংবিধান জাপান পেয়েছে, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সংবিধান সেটা নয়, বরং অনুসৃত ধারা বজায় রেখে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কার্যকর করে নেওয়া একটি সংবিধান। জাপানের নতুন সেই সংবিধান কার্যকর করার প্রক্রিয়াও ছিল গণতান্ত্রিক ধারা অনুসরণের আরেকটি দৃষ্টান্ত।
মেইজি সংবিধানে উল্লেখ থাকা সংশোধনের ধারা অনুসরণ করে পূর্ববর্তী সংসদকে দিয়ে সেটা অনুমোদন করে নেওয়া হয় এবং ১৯৪৮ সালে নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধপূর্ব সংসদ বিলুপ্ত করে দিয়ে নতুন নির্বাচন ডাকা হয়। ফলে সংবিধান কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে জাপানে কোনো রকম বিতর্ক বা সমালোচনা নেই, যদিও দক্ষিণপন্থি রাজনীতির পথ অনুসরণ করা অনেকেই যুদ্ধ পরিহারের একটি ধারা সংবিধানে
অন্তর্ভুক্ত থাকা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
জাপানের এই দৃষ্টান্ত সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন করে রচনার ক্ষেত্রে নির্বাচিত একটি সংসদের গুরুত্ব পরিষ্কারভাবে তুলে ধরছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল রচনা বা সেটা সংশোধন করে নেওয়ার দায়িত্ব কোনো অবস্থাতেই হাতে গোনা কয়েক জন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না এবং সেরকম কিছু করা উচিতও হবে না। ফলে সেই কাজ করতে হলে প্রথমেই যা দরকার হবে, তা হলো সাংবিধানিক একটি সংসদের জন্য নির্বাচন আহ্বান করা, নির্বাচিত যে সংসদের প্রধান দায়িত্ব হবে চলমান সংবিধান সংশোধন করে নেওয়া কিংবা নতুন একটি সংবিধান রচনা করা।
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করা নিয়ে যে ধোঁয়াশা এখন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে অন্য যে আরেকটি প্রসঙ্গের ওপর আলোকপাত করা দরকার তা হলো, আমাদের ১৯৭২ সালের সংবিধান খারিজ করে দিয়ে নতুন একটি সংবিধান কেন রচনা করা দরকার? বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রগতিশীল একটি সংবিধান হিসেবে অনেকেই গণ্য করেন, যদিও সংবিধানের প্রগতিশীল সেই দিকগুলোর অনেক
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান কিছুই পরবর্তী সময়ে কাটছাঁট করে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের কোনো বিধান বা দিকগুলো ত্রুটিপূর্ণ বা ভুল, সংবিধান নতুন করে লেখার কাজ শুরু করার আগে বাছাই করে নেওয়া কমিটির মনে হয় সেগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা দরকার। এমন কিছু ব্যক্তি আমাদের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান রচনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যাদের জ্ঞানের পরিব্যাপ্তি কিংবা দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানের শ্রেষ্ঠ বিভিন্ন দিক অনুসরণ করে রচিত তাদের সেই মূল সংবিধান আসলেই হয়ে উঠেছিল অগ্রসর একটি সংবিধান।
আগেই উল্লেখ করেছি যে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসন নিজেদের ক্ষমতা বিস্তৃত করে নেওয়া কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে সংবিধানের অগ্রসর অনেক দিক কেটে- ছেঁটে বাদ দিয়েছে। ফলে সংবিধানের যে আকার এখন দাঁড়িয়েছে, সেটা না হচ্ছে প্রগতিশীল, না হচ্ছে অগ্রসর। আর তাই সংবিধান সংস্কার করার কাজে হাত দিতে হলে শুরুতেই যা দরকার, তা হলো বিভিন্ন প্রশাসনের কাটছাঁট করে নেওয়া অংশগুলো বাদ দিয়ে আদিরূপে সেটাকে ফিরিয়ে নিয়ে এর কোন দিকগুলো ত্রুটিপূর্ণ, নাগরিকদের সামনে তা তুলে ধরা। তবে সেই দায়িত্ব যারা পালন করবেন, তারা অবশ্যই কারো নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়া ব্যক্তিত্ব হবেন না, বরং তাদের হতে হবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সংসদের প্রতিনিধি।
• লেখক: সাংবাদিক ও লেখক, বর্তমানে জাপানের এনএইচকে ওয়ার্ল্ডে কর্মরত
