অনলাইন জুয়ার ফাঁদ!

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪০

অনলাইন জুয়ার খবর এখন মানুষের মুখে মুখে। খেলার মাঠ, রাস্তার মোড়, গাছের ছায়া, ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান, ভ্যানগাড়িতে বসে অবাধে চলছে অনলাইন জুয়া। জুয়ার নেশা মানুষকে শেষ করে দেয়, তানতুন কিছু নয়। ছাত্র-যুবসমাজের ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে। ছাত্র-তরুণদের মধ্যে অনলাইন জুয়ায় আসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে ভয়াবহ ভাবে। অনেকে কৌতূহলবশত জুয়ার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে হয়ে যাচ্ছে জুয়ায় আসক্ত। 

মা-বাবার সান্নিধ্য, স্কুল-কলেজের পড়ালেখা, ব্যবসায়বাণিজ্য, চাকরি কিছুই জুয়া-আসক্তদের ধরে রাখতে পারছে না। সন্তানরা মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, নানা অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তার সবকিছুই করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোযোগ নেই, পারিবারিক অজুহাত দেখিয়ে স্কুলকলেজ ও কোচিং সেন্টারে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত, জুয়ায় টাকা খুইয়ে মানুষিক অশান্তি, খাওয়াদাওয়া, পড়ালেখায় মন নেই, সব সময় মাথায় ঘোরে জুয়ার লাভ-লোকসানের হিসাব। 

অনেক পরিবারে এখন চাপাকান্না ও ক্ষোভ, প্রকাশ করতে পারে না বাইরে। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকরা হতাশ। খেটে খাওয়া মানুষগুলো সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে কিছু আয় করে জুয়ার আসরে সর্বস্বান্ত হয়ে খালি হাতে খিটখিটে মেজাজ নিয়ে ফিরে আসে পরিবারের কাছে। দেখা দেয় পারিবারিক কলহ, অশান্তি, ঝগড়া-বিবাদ। দেশ ডিজিটাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধপ্রবণতাও ধরন বদলিয়ে হয়েছে ডিজিটাল। 

জুয়া খেলা ঘরের কোনা, জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনো বা জুয়া খেলার ঘর ছাড়িয়ে এখন চলে এসেছে মানুষের ঘরে ঘরে, হাতের মুঠোয়। জুয়া খেলা এখন আর পেশাদার জুয়াড়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে। ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবল, ক্রিকেট, লুডু, ক্যারামসহ প্রায় সব ধরনের খেলাধুলায়। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ খুঁজে পাচ্ছে নিত্যনতুন জুয়ার আসর। সময়ের প্রয়োজনে শিক্ষার্থী, যুবসমাজ, কর্মজীবী ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের হাতে হাতে এখন স্মার্ট মোবাইল ফোন। 

দেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বাণিজ্যের সুবিধার জন্য মোবাইল ফোনে দিচ্ছে ছোট বড় প্যাকেজ আকারে ইন্টারনেট সুবিধা, যা সব শ্রেণির মানুষের সাধ্যের মধ্যে। এতসব সুবিধা অনলাইন জুয়াকে করেছে সহজ থেকে সহজতর। অনলাইন জুয়ায় বড় ভূমিকা রাখছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের প্রায় সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে টার্গেট করে বিভিন্ন জুয়াভিত্তিক সাইটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের লোভনীয় বিজ্ঞাপন প্রচার করে যাচ্ছে। 

'গেম খেলে আয় করুন'-এমন হাজার হাজার টাকার বিজ্ঞাপন বারবার অনলাইনে প্রচার করা হয়। বিনা পরিশ্রমে লাখোপতি হওয়া যাবে, এমন বিজ্ঞাপনের লোভে পড়ে যাচ্ছে যুবসমাজ। অনলাইনে থাকলে অপ্রত্যাশিত ভাবে জুয়ার বিজ্ঞাপন সামনে চলে আসছে, বুঝে হোক, না বুঝে হোক বা কৌতূহলী হয়ে সেই বিজ্ঞাপন দেখে প্রবেশ করে জুয়ার আসরে। তরুণরাই তাদের মূল টার্গেট, একবার শুরু হলে আর ফেরার পথ নেই। জুয়ার বিজ্ঞাপনে অভিনয় করতে দেখা যায় বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটরসহ জনপ্রিয় ব্যক্তিদের।

অনলাইন জুয়া সাইটে টাকা লেনদেনে সুবিধা অনেক বেশি, বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ফলে জুয়া সাইটে টাকা বিনিয়োগ ও উত্তোলন অনেক সহজ। খুব সহজেই লেনদেন সম্পন্ন করা যায়। অনলাইন জুয়ায় বিভিন্ন গেমস, ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ফুটবল বিশ্বকাপসহ নানা বড় ইভেন্ট সামনে এলে জুয়ার কারবার জমজমাট হয়ে ওঠে। অধিকাংশ সাইটই পরিচালিত হয় দেশের বাইরে থেকে।

মূলত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে মেন্টরের অধীনে ভারত, দুবাই, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম থেকে ক্যাসিনো গেম পরিচালিত হয়। এক মেন্টরের অধীনে কয়েক হাজার প্লেয়ার অংশ নেয়। এসব মেন্টর মূলত অংশগ্রহণকারীদের আস্থা সৃষ্টির জন্য লাইভ স্ট্রিমিং গেম পরিচালনা করে থাকে। এ সুযোগে জুয়ায় বিনিয়োগ থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশে। ফলে একদিকে যেমন সর্বস্বান্ত হচ্ছে তরুণসমাজ, অন্যদিকে টাকা বিদেশে পাচার হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে অনেক তরুণের মধ্যে দেখা দিচ্ছে মাদকাসক্তির প্রবণতা। চিকিৎসকদের মতে, সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। জুয়ায় আসক্ত শিশু-কিশোররা পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে, সামাজিকভাবে এরা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। মেজাজ দেখাতে শুরু করে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর সবকিছুই করে আসক্তি
মেটাতে, টাকার প্রয়োজনে। 

জুয়ায় আসক্তদের ফেরাতে প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ। জুয়ার সাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য কঠোর অবস্থান নিতে হবে সরকারকে। পরিবারে থাকা কম্পিউটার-মোবাইল ফিল্টারিং করতে হবে। বাবা-মায়ের খেয়াল রাখতে হবে, সন্তান কী করছে। আর আসক্তদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন না করে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক জীবনে। অনলাইন জুয়ায় আসক্ত শিশুদের মনশ্চিকিৎসা নেওয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের এই মানসিক অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে বাবা-ছুটছেন মনশ্চিকিৎসকদের কাছে, অনেকেই সুফল ও পাচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। 

বিটিআরসি জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ৮ ধারা অনুযায়ী প্রতিনিয়ত চোখে পরামাত্র অনলাইন বেটিং সাইটগুলো বন্ধ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া খেলার সাইট পরিচালনার অনুমোদন নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা কোনো সংস্থা থেকে কোনো সাইট বন্ধের জন্য সুপারিশ করলে সেগুলো বাংলাদেশ থেকে ব্লক করে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিজ্ঞাপন বন্ধের জন্য গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবকে অনুরোধ করা হচ্ছে। তার পরও বন্ধ হচ্ছে না অনলাইন জুয়া খেলা, এজন্য প্রয়োজন পরিবারের কঠোর নজরদারি এবং সামাজিক প্রতিরোধ।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা

ইত্তেফাক/এনএন