তরুণরা কেন দেশ ছাড়িতে আগ্রহী?

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৩০

যেই তরুণরা দেশের জন্য জীবন বাজি রাখিতে পারেন, সেই তরুণরা কেন হতাশাগ্রস্ত হইয়া দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবেন? তাহাদের দেশে ধরিয়া রাখিবার উপায় কী? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা আজ দেশ ও জাতির জন্য জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। গত বুধবার ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে প্রকাশিত 'নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ ২০২৪' শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশের ৫৫ শতাংশ তরুণ বিদেশে যাইতে আগ্রহী। বেকারত্ব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগবৈষম্য ইত্যাদি কারণে তাহারা দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে পারিলেই বর্তিয়া যান। দেশে কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হইল? প্রকৃতপক্ষে তরুণদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাগুলি পূরণে আমরা উদাসীন বলিয়াই তাহাদের মধ্যে দেশ সম্পর্কে দেখা দিয়াছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। বিশেষ করিয়া, বেকারত্ব লইয়া তাহাদের ৪২ শতাংশই উদ্বিগ্ন। একসময় ঘরে ঘরে চাকুরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইলেও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমাদের ব্যর্থতায় তাহাদের মধ্যে এখন বিদেশমুখিতা বৃদ্ধি পাইয়া চলিয়াছে। 

দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ কর্মক্ষম তরুণসমাজ রহিয়াছে। আমাদের উন্নয়নকে টিকসই করিতে এই তরুণ সমাজকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করিতে হইবে। অনেক দেশ যোগ্য লোকের অভাবে অর্থনীতির ভিত্তি ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না। আর আমরা তারুণ্যশক্তির অপার সম্ভাবনাকে হাতে ধরিয়া অবহেলা করিয়া চলিয়াছি বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, বাংলাদেশে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের (তরুণ জনগোষ্ঠীর আধিক্য) সুবিধা সাময়িকভাবে এখনো চলিতেছে। আগামী ১৫-২০ বৎসরের মধ্যে ইহা শেষ হইয়া যাইবে। এই জন্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট সুযোগের যে অপচয় ঘটিতেছে, তাহা অবশ্যই বন্ধ করিতে হইবে। এখনই এই ব্যাপারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লইয়া অগ্রসর হইতে হইবে। নতুবা ব্রেইন ড্রেইন তথা মেধা পাচার হইতে আমরা রক্ষা পাইব না।

প্রতিটি উন্নত দেশই কোনো এক প্রজন্মের মেধা, ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হইয়া দেশকে উন্নত কাতারে লইয়া গিয়াছে। তাই তরুণদের কোনোভাবেই অবহেলা করা যাইবে না। আজ তাহাদের বিদেশমুখিতার মাধ্যমে আমরা হয়তো রেমিট্যান্স পাইয়া সাময়িকভাবে লাভবান হইতেছি, তবে মেধাবী প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী প্রমুখদের হারাইয়া আমরা তাহার চাইতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছি। তাহাদের পশ্চাতে জনগণের ঘাম ঝরানো করের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার লগ্নি ব্যর্থ হইতেছে। এই জন্য তাহাদের ধরিয়া রাখিতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। আমাদের তরুণেরা চাহেন, আধুনিক কর্মবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখিয়া গড়িয়া উঠুক পাঠদান ও পাঠ্যসূচি।

একটা সময় ছিল, যখন কেবল ধনীর দুলালরা লেখাপড়া শিখিতে বিদেশ যাইতেন। এখন মধ্যবিত্ত তো বটেই, সাধারণ গরিব ঘরের সন্তানেরাও উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশে চলিয়া যাইতেছেন। এমনকি উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যেও বিদেশ গমনের প্রবণতা বাড়িয়াছে। এইভাবে হাজার হাজার মেধাবী যদি দেশ ছাড়িতে থাকেন, তাহা হইলে এই দেশটিকে কাহারা আগাইয়া নিবেন? আমরা তাহাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়িয়া তুলিতে পারিতেছি না, তাহাদের দক্ষতা অনুযায়ী দেশে কাজের সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করিতে পারিতেছি না এবং উন্নত জীবনযাপন, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, মর্যাদা ইত্যাদির নিশ্চয়তা দিতে পারিতেছি না বলিয়াই তাহারা এইভাবে চলিয়া যাইতেছেন। 

আমরা আমাদের মেধাবী তরুণ-তরুণীদের হেলায় হারাইতে চাহি না। তাই তাহাদের দেশের কাজে লাগাইতে হইবে। বিদেশে থাকিলেও তাহাদের কীভাবে দেশমাতৃকার উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। এখনই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনীতিতে মেধাবী লোকদের সংকট দেখা দিয়াছে, তাহা হইলে ভবিষ্যতে আমরা কেমন বাংলাদেশ দেখিতে পাইব-তাহা সহজেই অনুমেয়। অতএব, দেশের মেধাবী তারুণ্য শক্তিকে মূল্যবান সম্পদ জ্ঞান করিয়া তাহার সর্বোত্তম সদ্ব্যবহারের প্রতি আমাদের এখনই মনোনিবেশ করিতে হইবে। নতুবা একদিন মেধাশূন্য হইয়া উদ্ভাবনী, জ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই উন্নত দেশ নির্মাণের স্বপ্ন আমাদের কোনো দিনই পূরণ হইবে না।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন