বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসের ইতিহাস ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি শুধু শহর পরিকল্পনার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির একটি উদ্যোগই নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনার অধ্যাপক কার্লোস মারিয়া ডেল্লা পাওলো প্রথম এই দিবসটি উদ্যাপনের প্রস্তাব দেন। মূলত নগর পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে একত্রিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সামাজিক ও পরিবেশগত সমতা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
৮ নভেম্বর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনসমূহ এ দিবসটি উদযাপন করে থাকে। প্রতিবারের মতো বাংলাদেশেও এবার যথাযথ মর্যাদায় এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো 'সমগ্র দেশের পরিকল্পনা করি, বৈষম্যহীন সুষম বাংলাদেশ গড়ি'। দিবসটি পালনের মাধ্যমে নগর পরিকল্পনাবিদগণ শহর উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা, টেকসই উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার সুযোগ তৈরি ও সর্বোপরি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। নগর পরিকল্পনা একটি বাস্তবমুখী বিষয়।
বৈশ্বিকভাবে নেওয়া এসডিজি ২০৩০ অর্থাৎ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের ১৯১টি দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এসডিজির ১১ নম্বর লক্ষাটি হলো টেকসই নগর সম্পর্কিত। টেকসই নগর তৈরি করার জন্য নগর পরিকল্পনায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। প্রতিটি শহর এলাকাই তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বতন্ত্র। এক এক শহরের জন্য চ্যালেঞ্জ এক এক রকম। যেমন ঢাকা শহরের জন্য নগর পরিকল্পনা হতে হবে এই শহরের মানুষকে নিয়ে।
২০০২ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস পালন করা হলেও ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে দিবসটি পালন করছে যথাযথ মর্যাদায়। সামগ্রিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ প্রায় ৮০ শতাংশ নগরায়ণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দ্রুত নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের ফলে শহরগুলোর ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় সঠিক পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকার মতো জনবহুল শহরে বাসস্থান যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নগর সুবিধার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ চাহিদা মেটাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে উঠায় নগরজীবন অবধারিতভাবে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, অতি খরা/বৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব সম্পর্কে নাগরিকদের সচেতন করা সম্ভব।
একটি সঠিক নগর পরিকল্পনা পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও গতিশীল করে। যেহেতু শহর এলাকায় অধিক মানুষ বসবাস করে, তাই পরিকল্পিত নগরায়ণ হলে নাগরিকদের জীবনের মান বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শহরে যানজট ও পরিবেশদূষণের মতো সমস্যাসমূহ এড়ানো সম্ভব হবে। যথাযথ পরিকল্পনা অর্থাৎ সঠিক জায়গায় স্কুল, হাসপাতাল, পার্ক, খেলার মাঠ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বাসস্থান স্থাপনের মাধ্যমে একটি শহরকে বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। এছাড়া পরিকল্পিত নগরায়ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা অর্থাৎ উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক এবং গ্রামীণ ও শহর এলাকায় সুযোগের অসমতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করার জন্য শুধু শহর নয়, বরং পুরো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো সম্ভব।
বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস উদ্যাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নগরায়ণের টেকসই ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব যেমন প্রতিফলিত হয় ঠিক তেমনই এটি একটি মঞ্চ যেখানে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং নাগরিক সমাজ একত্রিত হয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ খোঁজার চেষ্টা করেন। দিবসটি উদ্যাপনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনার নানা দিক, চ্যালেঞ্জ, বাস্তবতা, সমাধান সূত্র, আদর্শ উদাহরণসমূহ এবং সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়, যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি রূপরেখা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
সর্বোপরি বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস শুধু নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য একটি বিশেষ দিবস নয়, বরং এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি সচেতনতার সুযোগ, যেখানে একটি বাসযোগ্য, সুশৃঙ্খল, টেকসই নগর এবং সংশ্লিষ্ট জীবন মান গঠনে সবাই ভূমিকা রাখতে পারেন।
• লেখক: পরিকল্পনাবিদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের ফেলো ও নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক
