ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতি দূর হউক

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:৩০

গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত হইল 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার', তথা ভয় হইতে মুক্তি। কিন্তু ভয় হইতে মুক্তি আমাদের কবে মিলিবে? ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট তাহার স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে যে 'ফোর ফ্রিডমস' বা চারটি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন, তাহার মধ্যে রহিয়াছে-মতপ্রকাশ ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং দারিদ্র্য ও ভয় হইতে মুক্তি। আর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেওয়া হয়, সেইখানে এই 'ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার'-এর কথাও বলা হয়। কেননা ভয় তথা ভয়ের পরিবেশ যে কোনো সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির প্রতিবন্ধক। ভয়ভীতির মধ্যে থাকিয়া মানুষ সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে বাঁচিয়া থাকিবার কথা চিন্তা করিতে পারে না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তৃতীয় বিশ্ব তথা উন্নয়নশীল দেশগুলিতে আজ ভয়ের সংস্কৃতি জাঁকিয়া বসিয়াছে মারাত্মকভাবে। সেইখানে পদে পদে বিরাজ করিতেছে ভয়, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বিশেষত ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি হইতে তাহাদের যেন কোনো পরিত্রাণ নাই।

বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের সময় দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এমন ভাষায় কথা বলেন, যাহার মাধ্যমে প্রকারান্তরে ভোটারদের প্রতি ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। যেইভাবে পক্ষ-বিপক্ষ তুলিয়া গালাগালি ও হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, তাহাতেও অনেকে ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়েন। উন্নয়নশীল দেশ তো বটে, সাম্প্রতিক কালে কোনো কোনো উন্নত দেশেও এমন পরিস্থিতি লক্ষ করা গিয়াছে। শুধু নির্বাচনের সময় নহে, সারা বৎসরই উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতির একটা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে, হুমকি-ধমকির মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা। এমন কথাও বলিতে শুনা যায় যে অমুককে ও তাহাদের দোসরদের গ্রেফতার করা না হইলে জনগণ আইন হাতে তুলিয়া লইবে। অথচ একদা তাহাদের উপরও আইন হাতে তুলিয়া লইবার নজির রহিয়াছে। ইহাতে তাহারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হন। এখন তাহাদের মুখে একই রকম কথার প্রতিধ্বনি কি শোভা পায়? ইহা ছাড়া 'সমুচিত' জওয়াব দেওয়া হইবে কিংবা অমুকের রাজনীতিতে কোনো জায়গা নাই ইত্যকার কথাবার্তায় জনমনে ভীতি ছড়ানো ছাড়া ইহার উদ্দেশ্যই-বা কী? এই দিকে প্রতিপক্ষও কম কীসে? তাহারাও হুংকার ছাড়েন এই বলিয়া যে, সাহস থাকিলে তাহারা তাহাদের এলাকায় আসুন। ইহাতে কেহ ফেরত যাইতে পারিবেন না। অর্থাৎ তাহারা প্রাণ লইয়া ফিরিয়া যাইতে পারিবেন না। প্রতিপক্ষকে তাহারা পরগাছার সহিত তুলনা করেন, যাহাদের নিজস্ব কোনো শক্তি নাই। এইভাবে রাজনৈতিক ময়দানে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাকে যে বিনষ্ট করিবার অপপ্রয়াস চলে, তাহাতে কি কোনো সন্দেহ আছে?

ভয়ভীতির সংস্কৃতি বজায় থাকিলে কোনো দেশ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি কোনো ক্ষেত্রেই সফল হইতে পারে না। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন: 'ভয় তার বাহিরেতে,/ ভয় তার অন্তরে,/ ভয় তার ভূত-প্রেতে/ভয় তার মন্তরে।' অর্থাৎ উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলিতে ভয় কোথায় নাই? সকল খানেই ভয় আছে-কম আর বেশি। এই ভয়ের পরিবেশের সহিত অনেক সময় জড়িত থাকে ভূরাজনীতিও। তাই এই ভয়কে জয় করিতে হইলে গণতান্ত্রিক আচরণের কোনো বিকল্প নাই। এই জন্য সর্বত্র পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। আমাদের মানসিক ও আবেগীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেওয়া। অন্যের অধিকারের প্রতি সজাগ ও সচেতন থাকা। নতুবা আমরা ভয়ের সহিত বসবাসের দুর্ভাগ্য হইতে কখনো মুক্তি পাইব না। এই ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যতই শুভবুদ্ধির পরিচয় প্রদান করিবেন, ততই মঙ্গল।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন