ফাইল ও দীর্ঘসূত্রতার সংস্কৃতি

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:৩০

কয়েকটা ঘটনার অবতারণা করি প্রথমে। লাখো উদাহরণ আছে দেশের সব মানুষের কাছে। তার মধ্য থেকে কয়েকটা। কোনো এক সরকারি হাসপাতালে অ্যান্ডোসকপি ও বায়োপসি মেশিন পড়ে আছে। সেখানে কোনো টেস্ট করা হচ্ছে না। ডাক্তার বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে বললেন। আমি ভাবলাম সেখানে বোধহয় কোনো পার্সেন্ট আছে ডাক্তারের। সচরাচর যেটা হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার পর বুঝতে পারলাম এসব টেস্টের জন্য তার কোনো পার্সেন্টেজ তিনি নেন না। কারণ যে কোনো এক ল্যাব এবং যে কোনো জায়গা থেকে পরীক্ষা করতে বলেছিলেন। আমি আরো একটু গভীরে গেলাম। তিনি আমার কিছুটা পরিচিত। বিস্তারিত জানলাম। 

যে ধরনের মেশিনের চাহিদা তারা দিয়েছিলেন, সেসব মেশিন ভালোটা জার্মানের তৈরি। দামও বেশ। কিন্তু সে হাসপাতালে যে মেশিন আছে তার কোয়ালিটি ভালো নয়। সঠিক মান নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। সে জন্য বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে বললেন। জাতীয়ভাবে সারা দেশের মেডিক্যালগুলোতে এসব মেশিন সরবরাহ করতে মেশিন ক্রয়ের জন্য কমিটি গঠিত হয়। সেই মেশিন ক্রয় করার জন্য এক জন সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে দুই জন যুগ্ম সচিব এবং দুই জন ডাক্তারের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। সেখানে চাহিদা চাওয়া হয়। ডাক্তার দুই জনের ওপর পড়ল মেশিন স্পেসিফিকেশন করার দায়িত্ব। 

মূল ক্রয় কমিটিতে যখন মূল্য এবং স্পেশিফিকেশন উপস্থাপন করা হলো, তখন প্রশাসনিক সচিবগণ দেখালেন যে, উপস্থাপিত মূল্যের চেয়ে একই স্পেশিফিকেশনে অনেক কম মূল্যে ঐ মেশিন পাওয়া যায়! তাহলে এত দামি মেশিন কেনা কেন? ফাইল পড়ে থাকল বহু দিন। বছরও। কিন্তু মেশিন তো প্রয়োজন। শেষে বাজেট হলো জার্মান মেশিন অনুযায়ী কিন্তু ক্রয়ের সময় কেনা হলো চায়না মেশিন। যার কারণে মেডিক্যালগুলোতে এরকম বহু মেশিন পড়ে আছে। তার কোনো সুবিধা দেশের মানুষ পাচ্ছে না। দেশের মানুষ বা রোগী সুবিধা পাক বা না পাক, সেটা মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় লাল ফিতাওয়ালাদের পকেট ভারী হলো।

আরেকটি ঘটনা। কোনো এক টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ইনস্ট্রাক্টর ট্রেনিং শেষের দিন সমাপনী অনুষ্ঠানে সচিব স্যারের কাছে তাদের চাকরির বেশ কিছু সুবিধাদি না পাওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেন। সচিব মহোদয় জিগ্যেস করেন, এই প্রতিষ্ঠান কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন? তিনি জানতেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে শুধু ৪৯টি পলিটেকনিক আছে। অথচ তিনি এই খবর জানতেন না যে, সারা দেশে সেই সময় ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ ছিল! বর্তমানে ১৫৭টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ রয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুই ধরনের শিক্ষক রয়েছেন: আবশ্যিক দুটো বিষয় টেকনিক্যাল এবং জেনারেল বিষয়ের। বিভিন্ন সুবিধাবঞ্চিত জেনারেল শিক্ষকগণ তাদের দাবির কথা বলতে গেলেই প্রত্যেক পর্যায়ের লাল ফিতাওয়ালাদের এ বিষয়টা বোঝাতেই পাঁচ-ছয় মাস যায়। এরপর যখন তিনি বোঝেন তখন তার বদলির সময় হয়ে যায়। এদিক থেকে যারা পকেটে কিছু দিতে পারে তারা সব সুবিধা পেয়ে যান। আরো একটা ঘটনা বলি। সারা দেশে ৩২৯টি নতুন টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সেসবের কোনো কার্যক্রম চালুই হয়নি ঠিকমতো। জমি অধিগ্রহণও হয়নি। কিন্তু ঐ যে, তাদের প্রয়োজনে সে প্রকল্পের নামে ল্যাপটপ কেনার অনুমোদন হয়ে গেল! ল্যাপটপ হলো, পকেট ভারী হলো। প্রতিষ্ঠান হোক বা না হোক।

সমস্ত উন্নত দেশে শিক্ষকদের মর্যাদা আলাদা। কারণ তাদের হাত ধরেই জাতি গঠন হয়। একমাত্র আমাদের দেশেই শিক্ষকরা পদানত জাতি। তাদের কোনো দাবি আদায় হয় না। তাদের স্বতন্ত্র কোনো সম্মান নেই। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশেই স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো এবং সম্মানজনক বেতন কাঠামো রয়েছে, যাতে করে শিক্ষকদের সম্মানজনক জীবিকার চিন্তা আলাদাভাবে না করতে হয়। আর আমার দেশে? বাধ্য হয়ে তারা প্রাইভেট পড়াতে যায়। পাদটীকা? মনে আছে? সাহেবের তিন ঠ্যাংয়ের সেই কুকুরের মাসিক খরচের তিন ভাগের এক ভাগ বেতন পণ্ডিত পরিবারের! লজ্জা, জাতির জন্য। এখনো কি তা নেই? সেই চেতনা থেকে আমার দেশ বেরোতে পারেনি শুধু আমলাদের বাধা দেওয়ার কারণে। পণ্ডিত তথা শিক্ষকদের পেট নেই, সংসার নেই, পরিবার নেই! সম্মান? সেটা শুধু ছাত্রদের কাছেই। তাও বা কতটুকু? ডিসির বেতন কত? তাদের সম্মান কত? কেন তাদের এত তওয়াজ! তাদের তওয়াজ করলে যে ক্ষমতাটা মেলে!

কোনো এক দার্শনিক বলেছিলেন, মেধা আর শয়তানি এক হয়ে গেলে তার চেয়ে ভয়ংকর আর কিছুই হতে পারে না। অপ্রিয় হলেও সত্যি, সব জায়গাতে এরা বসে আছে। শুধু বসে নেই, নিজের পকেট ভারী করছে। আর কাউকেই এরা কোনো জায়গা দিতে চায় না। ধরা যাক স্বাস্থ্য বিভাগ, এ বিভাগের কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এটা তো ডাক্তারদেরই ভালো বোঝার কথা। সেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের অর্থাৎ সচিব এবং মন্ত্রী হবেন একজন ডাক্তার। এমনিভাবেই শিক্ষা বিভাগে, কৃষি বিভাগে, সমব্যয়ে, সংস্কৃতিতে, অর্থে, পরিকল্পনায় স্ব স্ব বিভাগেরই একজন। তাহলে সেই বিভাগ যত সুন্দর ও সাবলীলভাবে পরিচালিত হবে অন্য কেউ এসে সেখানে মাথা ঢুকালে গরমিল তো হবেই। আপনার বাড়ির ভেতরের বিষয়াদি আপনিই ভালো জানেন।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

ইত্তেফাক/এনএন